জীবনের শেষ বয়সে এসে মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে ওঠে সন্তান, পরিবার আর একটি নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে এসে একেবারেই অসহায়, অবহেলিত ও অনাহুত হয়ে পড়েছেন আশেক আলী ও আবেদা বেগম। তাদের জীবনের গল্প এখন শুধুই বেঁচে থাকার সংগ্রাম, ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা আর চোখভরা কান্নার নাম।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দহবন্দ ইউনিয়নের রাস্তার ধারে ছোট্ট একটি টিনের চালায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন এই বৃদ্ধ দম্পতি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর, চোখেমুখে হতাশা আর বুকভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে প্রতিটি দিন পার করছেন তারা। যাদের জন্য একসময় সারাজীবন পরিশ্রম করেছেন, সেই সন্তানদের কাছেই আজ তারা যেন অচেনা মানুষ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ব্যস্ত সড়কের পাশে পুরনো টিন ও বাঁশ দিয়ে চালা তুলে বসবাস করছেন তারা। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, ঝড়-বৃষ্টির এক ঝাপটাতেই হয়তো ভেঙে পড়বে পুরো ঘরটি। দুইটি চালার একটিতে দেখা যায় একটি চৌকি, কিছু আসবাবপত্র, ছাগল ও মুরগিসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। উঠোন যেন তাদের রাস্তা।
অন্য চালার ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে দারিদ্র্যের নির্মম চিত্র। নেই কোনো ভালো বিছানা। মাটির ওপর পুরনো খাট, এক খাটেই ঘুমান নাতি-নাতনি সহ চারজন। পাশে কয়েকটি ভাঙা হাঁড়ি-পাতিল ও ছেঁড়া কাপড়ের স্তুপ। আর এক পাশে আলোকচুলার পাশে ছোট একটি ভাতের হাঁড়ি—এটাই তাদের পুরো সংসার।
স্থানীয়রা জানান, আশেক আলীর নিজের কোনো জমিজমা নেই। দীর্ঘদিন তিনি অন্য জায়গায় বসবাস করছিলেন। সেখান থেকে উঠে এসে রাস্তার পাশে এক আত্মীয়ের জমিতে থাকতেন। কিন্তু প্রায় এক মাস আগে সেখান থেকে উচ্ছেদের পর আর কোথাও ঠাঁই হয়নি তাদের। আত্মীয়স্বজন কিংবা সন্তানদের বাড়িতেও মেলেনি আশ্রয়। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে রাস্তায় ছোট্ট চালা তুলে বসবাস শুরু করেন তারা। পরে জানা যায়, যে জমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে সেটিও খাস জমি—এখন তারা ভিটেমাটিহারা।
আশেক আলীর পরিবার ছোট ছিল না। দুই ছেলে ও পাঁচ মেয়েকে নিয়ে ছিল তাদের বড় সংসার। বহু কষ্ট করে সন্তানদের বড় করেছেন, বিয়ে দিয়েছেন। একসময় মাছ বিক্রি করে সংসার চালাতেন তিনি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাটে-বাজারে ঘুরে মাছ বিক্রি করেই চলত সংসার। অভাব ছিল, কিন্তু পরিবার ছিল একসাথে। এখন বয়সের ভারে শরীর ভেঙে পড়েছে। আগের মতো আর কাজ করার শক্তি নেই। চোখে কম দেখেন, হাঁটতেও কষ্ট হয়। ফলে আয়-রোজগারের পথও বন্ধ হয়ে গেছে।
অন্যদিকে স্ত্রী আবেদা বেগমের কাঁধেই এখন পুরো সংসারের দায়িত্ব। বয়স প্রায় ৬০ ছুঁইছুঁই হলেও প্রতিদিন মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ভিক্ষা করতে হয় তাকে। কখনো এক মুঠো চাল, কখনো একটু খাবার—এভাবেই চলে তাদের দিন। ভিক্ষা করে যে চাল পান, সেটুকু দিয়েই রান্না হয় চারজনের খাবার ও তরকারিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস। মাঝে মাঝে দুই-এক বেলা অনাহারেও থাকতে হয় তাদের।
এই ছোট্ট কুটিরে শুধু বৃদ্ধ দম্পতিই নন, তাদের সঙ্গে রয়েছে নাতি-নাতনি মোস্তফা ও মিম। শিশু দুটির ভবিষ্যৎ নিয়েও রয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
বৃষ্টির সময় তাদের দুর্ভোগ আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ভাঙা টিনের ফুটো দিয়ে পানি পড়তে থাকে ঘরের ভেতর। ভিজে যায় কাপড়, বিছানা, খাবার—সবকিছু। কখনো কখনো পুরো রাত জেগেই কাটাতে হয় তাদের। ছোট্ট শিশু দুটিকে কোলে নিয়ে রাতভর বৃষ্টির পানি সামলাতে হয় আবেদা বেগমকে।
কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন আবেদা বেগম। তিনি বলেন,
“বাবা, জীবনে এত কষ্ট কখনো করি নাই। এখন বয়স হইছে, শরীরে আর শক্তি নাই। তারপরও মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভিক্ষা করতে হয়। অনেক সময় কেউ কিছু দেয়, আবার অনেক সময় খালি হাতেই ফিরতে হয়। সারাদিন গ্রাম ঘুরে ২-৩ সের চাল পাই। সেই চাল দিয়ে নুন, তেল, মরিচ, আলু, বেগুন যা হয় তাই কিনে আনি, সেটুকু দিয়েই পেটের ভাত জোটে। বৃষ্টি আইলে ঘরের ভেতর পানি পড়ে, ঘুমাইতে পারি না। শুধু একটা থাকার জায়গা চাই, যেখানে শেষ বয়সটা শান্তিতে কাটাইতে পারমু।”
বৃদ্ধ আশেক আলীও অনেকটা নীরব। দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে বলেন,
“ছেলে-মেয়ে সবাই নিজের সংসার লইয়া ব্যস্ত। কেউ আর খোঁজ নেয় না। আগে মাছ বিক্রি কইরা সংসার চালাইতাম। এখন শরীরে আর শক্তি নাই। কাজ করতে পারি না। অনেক সময় না খাইয়া থাকি।”
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এত অসহায় অবস্থায় থাকার পরও এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি সহায়তা তাদের ভাগ্যে জোটেনি। জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই বিষয়টি জানলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। স্থানীয়দের মতে, একটি সরকারি ঘর বা আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা গেলে অন্তত মাথা গোঁজার ঠাঁই পেত পরিবারটি।
সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সমাজে পারিবারিক বন্ধন ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে এমন ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। একসময় গ্রামের সমাজব্যবস্থায় বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব সন্তানরাই নিত। এখন অনেক ক্ষেত্রেই বৃদ্ধরা অবহেলিত হয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারে এই সংকট আরও প্রকট।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু তাদের সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের বিষয়টি এখনো অনেকাংশেই অনিরাপদ। আশেক আলী ও আবেদা বেগমের মতো অসংখ্য মানুষ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, শুধু সরকারি সহায়তা নয়, সমাজের বিত্তবান ও সচেতন মানুষদেরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন। একটি ঘর, কিছু খাবার কিংবা নিয়মিত সহযোগিতা হয়তো বদলে দিতে পারে এমন একটি পরিবারের জীবন।
আবেদা বেগমের শেষ কথাগুলো যেন পুরো সমাজের প্রতি এক নীরব প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। তিনি বলেন,
“আমরা তো বেশি কিছু চাই না বাবা। শুধু একটা ছোট্ট ঘর চাই, থাকার জায়গা চাই। মরার আগে যেন শান্তিতে দুইটা দিন কাটাইতে পারি।”
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছোট্ট কুটিরটি যেন আজ শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়, বরং সমাজের অবহেলা, দারিদ্র্য আর মানবিক সংকটের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। যেখানে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া দুইজন মানুষ প্রতিদিন লড়াই করছেন শুধু বেঁচে থাকার জন্য।
তাই এখনই পরিবারটির জন্য টেকসই সহায়তার দাবি জানিয়েছেন অনেকে।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি 























