পুরোনো বছরের সকল গ্লানি, দুঃখ আর জরাজীর্ণতাকে ধুয়ে-মুছে নতুনকে বরণ করে নিতে পাহাড়জুড়ে বইছে উৎসবের আমেজ। এই আনন্দধারাকে পূর্ণতা দিতে রাঙামাটিতে সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়েছে মারমা জনগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসব ‘সাংগ্রাই’।
শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সকালে রাঙামাটি মারী স্টেডিয়ামে মারমা সংস্কৃতি সংস্থা (মাসস)-এর উদ্যোগে দিনব্যাপী এই বর্ণিল উৎসবের আয়োজন করা হয়। আলোচনা সভা শেষে অতিথিরা একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে ‘সাংগ্রাই মৈত্রী জল উৎসব’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
উৎসবস্থলে দেখা যায়, দুই লাইনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মারমা তরুণ-তরুণীরা একে অপরের গায়ে অবিরাম পানি বর্ষণ করছেন। মারমাদের ভাষায় একে বলা হয় ‘সাংগ্রাই রিলং পোয়ে’, যার মূল সুর হলো শুদ্ধতা আর ভালোবাসায় আগামীকে বরণ করে নেওয়া।
মাসস-এর উৎসব উদযাপন কমিটির সভাপতি পাইচিমং মারমা বলেন, “সাংগ্রাই কেবল একটি উৎসব নয়, এটি পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আত্মপরিচয় ও ঐক্যের প্রতীক। নতুন প্রজন্মের কাছে নিজেদের কৃষ্টি তুলে ধরাই এই আয়োজনের লক্ষ্য।”
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন।
পার্বত্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান তাঁর বক্তব্যে বলেন, “পাহাড়ের সকল অধিবাসীদের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাই আমাদের সরকারের লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে ‘রংধনু জাতি’ গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন, আমরা সকলে মিলেমিশে তা বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধ থাকবো।”
প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বলেন, “মারমা জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, এই পবিত্র পানি কেবল দেহ নয়, মনকেও পরিশুদ্ধ করে। পুরোনো বছরের সকল কষ্ট পেছনে ফেলে নতুন বছরে শান্তি ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার শপথ নেন উৎসবকামী মানুষ।”
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য মো. হাবীব আজম। তিনি বলেন, “পুরাতন বছরের সব গ্লানি মুছে বৈসাবি ও সাংগ্রাইয়ের এই মিলনমেলা প্রতিটি ঘরে ঘরে শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনুক।”
অতিথিদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক নেতা কামাল পারভেজ, বাসস নেতা ও সিনিয়র সাংবাদিক হায়দার আলি, সিআরএ সভাপতি সোহাগ আরেফিন এবং বিএসসি নেতা মেহেদী হাসান রিয়াদ। বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে পাহাড়ের এই বর্ণিল উৎসবকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁরা প্রত্যাশা করেন, সাংগ্রাইয়ের এই পানি মানুষের হৃদয়ের সকল বিদ্বেষ মুছে দিয়ে একটি সুন্দর ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
সাংস্কৃতিক পর্বে মারমা শিল্পীদের ঐতিহ্যবাহী গান ও নাচের ছন্দে পুরো স্টেডিয়াম এলাকা একখণ্ড পাহাড়ি জনপদে রূপ নেয়। জল উৎসবের এই বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়েই পর্দা নামলো পাহাড়ের সবচেয়ে বড় সামাজিক উৎসবের।
সোহাগ আরেফিন, রাঙামাটি থেকে ফিরে 


















