কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান হোক, দৃঢ়ভাবে, কঠোরভাবে, কোনো আপস ছাড়াই। অপরাধী যে বয়সেরই হোক, অপরাধ করলে তাকে আইনের আওতায় আনতেই হবে। কিশোরদের ব্যবহার করে যারা অপরাধজগৎ তৈরি করছে, তাদেরও খুঁজে বের করতে হবে। দেবিদ্বার থানা পুলিশ কিশোর গ্যাংবিরোধী যে অভিযান পরিচালনা করছে, সেই উদ্যোগকে তাই সাধুবাদ জানাতেই হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, অপরাধী ধরার এই অভিযানে নিরপরাধ কেউ শিকার হচ্ছে না তো? আর যদি হয়ে থাকে, তার দায় নেবে কে? এই প্রশ্ন এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
রাতের আঁধারে আটক, কিন্তু শনাক্ত করার পদ্ধতি কী?
সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লার দেবিদ্বারে রাতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুলসংখ্যক কিশোর ও যুবককে থানায় নিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। তথ্যমতে, আটক ব্যক্তিদের কারও কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে কি না, সে বিষয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে যাচাই করা হয়। যাচাই-বাছাই শেষে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ না থাকলে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়েও দেওয়া হয়।
এখানেই মূল প্রশ্ন। একজন কিশোরকে কিশোর গ্যাং হিসেবে চিহ্নিত করার সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড কী? তার বিরুদ্ধে কি কোনো মামলা আছে? নাকি আছে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ? অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কোনো তথ্য বা প্রমাণ আছে? কিংবা আছে গোয়েন্দা তথ্য? নাকি রাতে রাস্তায়, বাজারে কিংবা কোনো স্থানে কয়েকজন কিশোর-যুবককে একসঙ্গে পাওয়া গেলেই তাঁদের সন্দেহভাজন হিসেবে থানায় তুলে আনা হচ্ছে?
পুলিশ যদি সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযান চালায়, তাহলে সেই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থাকার কথা নয়। কিন্তু রাতের আঁধারে একসঙ্গে রাস্তায় পাওয়া যাওয়া আর অপরাধে জড়িত থাকা এক বিষয় নয়।
একজন তরুণ বিশেষ কারণে রাতে বাইরে থাকতেই পারেন। কয়েকজন বন্ধু একসঙ্গে আড্ডা দিতেই পারেন। এগুলো আমাদের দেশের আইন বা সংবিধানবিরোধী কর্মকাণ্ড নয়। এ ছাড়া কারও পোশাক, বয়স, চলাফেরা কিংবা সামাজিক পরিচয় তাঁকে অপরাধী বানায় না। অপরাধী চিহ্নিত করতে হবে অপরাধের তথ্য দিয়ে, সন্দেহের চেহারা দেখে নয়।
৩০-৪০ জনকে ধরা হলো, শেষ পর্যন্ত থাকল কয়েকজন, কেন?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, একটি অভিযানে যদি ৩০, ৪০ কিংবা তারও বেশি বা কম কিশোর-যুবককে থানায় নেওয়া হয়, এরপর যাচাই-বাছাই করে তাঁদের বড় একটি অংশকে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয় এবং কয়েকজনকে রেখে দেওয়া হয়, তাহলে এই বাছাই প্রক্রিয়ার ভিত্তি কী?
যাঁরা ছাড়া পেলেন, তাঁরা কেন ছাড়া পেলেন? যাঁরা থেকে গেলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কী পাওয়া গেল? এই সিদ্ধান্তের লিখিত রেকর্ড আছে কি? পুলিশ কর্মকর্তা কোন তথ্যের ভিত্তিতে একজনকে ছেড়ে দেওয়ার এবং অন্যজনকে আইনি প্রক্রিয়ায় রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন? জনগণ কি কখনো জানতে পারবে?
এসব প্রশ্ন করা পুলিশের অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য নয়, বরং উল্টোটা। একটি অভিযানকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে তুলতে হলে তার পদ্ধতিটিই স্বচ্ছ করতে হবে। কারণ ‘গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান’ বলা সহজ, কিন্তু সেই তথ্য কীভাবে যাচাই হলো, সেটিই আসল বিষয়।
‘নীল খাম’ আর ‘লাল টেলিফোন’, এগুলো কি শুধুই রূপকথা?
সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্নটি এখানেই। একসঙ্গে অনেককে আটক করা হলো। পরে যাচাই-বাছাই হলো। কেউ রইলেন, কেউ চলে গেলেন। সাধারণ মানুষের মনে তখন প্রশ্ন আসবেই, এই বাছাই কি শুধু তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে? নাকি পরিচয়, সুপারিশ, প্রভাব কিংবা আর্থিক লেনদেনও কোথাও কোনো ভূমিকা রাখে?
আমি বলছি না যে এমনটি ঘটছে। কিন্তু প্রশ্নটি উঠছে, আর প্রশ্ন ওঠার কারণ থাকলে তার উত্তর দেওয়ার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
‘নীল খাম’ কিংবা ‘লাল টেলিফোন’ এখানে কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ নয়। এগুলো আমাদের সমাজে প্রচলিত তদবির, প্রভাব ও অদৃশ্য ক্ষমতার প্রতীকী ভাষা। পুলিশ চাইলে খুব সহজেই এই সন্দেহ দূর করতে পারে। আটক, যাচাই, মুক্তি ও আইনি ব্যবস্থা, প্রতিটি ধাপের একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়া প্রকাশ করলেই প্রশ্নের বড় একটি অংশের উত্তর পাওয়া যায়।
সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গাটি অন্যত্র
তবে এই অভিযানের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হয়তো শুধু একজন নিরপরাধ কিশোরকে কয়েক ঘণ্টা থানায় রাখা কিংবা জেল হাজতে পাঠানো নয়। ভয়ংকর বিষয়টি হতে পারে, তারপর কী হয়?
ধরা যাক, একজন কিশোরের কোনো অপরাধ নেই। আগে কোনো মামলা নেই। কোনো অপরাধী চক্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই। কিন্তু রাতের অভিযানে তাকে ধরে থানায় নেওয়া হলো। তার পরিবার আতঙ্কিত হলো। পাড়া-প্রতিবেশী জানল, পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেছে। স্কুল, কলেজ, বন্ধু ও পরিচিতজনদের মধ্যে ছড়িয়ে গেল, ‘ওকে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে ধরা হয়েছে।’
পরে হয়তো পুলিশ যাচাই করে তাকে ছেড়ে দিল কিংবা জেল হাজতে পাঠিয়ে দিল। এরপর যখন সে ছাড়া পেল, জামিনে মুক্তি পেল কিংবা খালাস পেল, তখন কি সমাজ তাকে ছেড়ে দেবে? আইনের খাতায় সে নিরপরাধ কিংবা বিচার বা তদন্তাধীন হতে পারে; কিন্তু মানুষের চোখে?
সেখানেই শুরু হয় আসল বিপদ। একজন নিরপরাধ কিশোরের ওপর যদি বিনা অপরাধে অপরাধীর তকমা বসে, তাহলে ওই ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারকে থাকতে হয় আতঙ্কে, সহ্য করতে হয় অপমান ও সামাজিক চাপ।
এরপর যদি সেই তরুণ সমাজের এই অবিশ্বাস, অপমান, রাগ ও ক্ষোভ সহ্য করে বড় হতে থাকেন, তাহলে তাঁর মধ্যে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি বিরূপতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তখন ওই তরুণের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, ‘আমি যখন অপরাধ করিনি, তখনও যদি আমাকে অপরাধী মনে করা হয়, তাহলে আমি অপরাধী হলেই বা ক্ষতি কী?’
তবে এটি কোনো কিশোরের অপরাধী হয়ে যাওয়ার অনিবার্য সূত্র নয়। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধবিষয়ক আলোচনায় সামাজিক কলঙ্ক, বর্জন ও নেতিবাচক পরিচয় একজন মানুষের ভবিষ্যৎ আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে, এই ঝুঁকিকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অর্থাৎ অপরাধী ধরতে গিয়ে যদি নিরপরাধ একজন তরুণের সামাজিক পরিচয়ই নষ্ট করে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, ভবিষ্যৎ সমাজের জন্যও ঝুঁকি।
তাহলে প্রশ্ন থাকবে, আইন প্রয়োগের কোনো ভুলের কারণে একটি জীবন অপরাধের দিকে ঠেলে গেলে সেই ভুলের জবাবদিহি কোথায়? সেই নিরপরাধের পরিণতির দায় কার? শুধুই তরুণের? নাকি সন্দেহভাজন থেকে অপরাধী কিংবা নিরপরাধ বাছাইয়ের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ারও কোনো দায় আছে? আর সেই দায় কি নেবে প্রশাসন? নাকি বিচারব্যবস্থার দরজায় গিয়ে সেই পরিবারকে ন্যায়বিচার চাইতে হবে?
এ প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, রাষ্ট্রের হাতে কাউকে আটক করার ক্ষমতা আছে; কিন্তু সেই ক্ষমতার সঙ্গে একজন নিরপরাধ নাগরিকের মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ রক্ষার দায়িত্বও আছে।
কিশোর অপরাধ দমনের লক্ষ্য হওয়া উচিত অপরাধ কমানো, কোনো কিশোরকে ভয় দেখানো, অপমান করা কিংবা সামাজিকভাবে চিহ্নিত করা নয়। তাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রশাসনের লক্ষ্য রাখা জরুরি, কিশোর গ্যাং দমন করতে গিয়ে যেন নতুন কিশোর গ্যাং তৈরি না হয়।
একজন অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা সমাজকে নিরাপদ করে। কিন্তু একজন নিরপরাধকে অপরাধীর তকমা দেওয়া সমাজকে নিরাপদ করে না, বরং উল্টো একটি সম্ভাব্য ক্ষত তৈরি করে।
তাই পুলিশের কাছে প্রশ্নটি খুব সরল, আপনারা কিশোর গ্যাং ধরছেন, নাকি কিশোর ধরছেন? দুটোর মধ্যে পার্থক্য বিশাল।
আর এই কথাটিও পরিষ্কার হওয়া দরকার, পুলিশকে প্রশ্ন করা মানেই পুলিশের বিরোধিতা নয়। বরং পুলিশ যখন রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ করে, তখন তার প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার নাগরিকের আছে।
আমরা চাই পুলিশ শক্ত হাতে অপরাধ দমন করুক। আমরা চাই প্রকৃত কিশোর গ্যাং সদস্যরা আইনের আওতায় আসুক। আমরা চাই, যাঁরা কিশোরদের অপরাধে ব্যবহার করেন, সেই বড়দেরও চিহ্নিত করা হোক।
কিন্তু একই সঙ্গে আমরা চাই, একজন নিরপরাধ কিশোর যেন পুলিশের একটি ভুল শনাক্তকরণের কারণে সারা জীবনের জন্য অপরাধীর তকমা না পায়। কারণ একটি ভুল মামলা সংশোধন করা যায়। একটি ভুল আটকও পরে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু একটি তরুণ জীবনের ওপর সমাজের বসিয়ে দেওয়া ‘অপরাধী’ পরিচয় সব সময় মুছে ফেলা যায় না।
অভিযান হোক, কিন্তু প্রমাণের ভিত্তিতে
দেবিদ্বারে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চলুক। প্রয়োজনে আরও জোরদার হোক। কিন্তু সেই অভিযানের প্রতিটি ধাপে থাকুক তথ্য, প্রমাণ, নির্দিষ্ট অভিযোগ, আইনসম্মত প্রক্রিয়া, স্বচ্ছ যাচাই ও জবাবদিহি।
একজনকে কেন আটক করা হলো, তার কারণ থাকতে হবে। কেন ছেড়ে দেওয়া হলো, তারও কারণ থাকতে হবে। কেন একজনের বিরুদ্ধে মামলা হলো, তারও নথিভুক্ত ভিত্তি থাকতে হবে। আর যদি কেউ ভুলভাবে আটক হয়ে থাকেন, তাঁর সম্মান ও সামাজিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারের বিষয়টিও প্রশাসনের বিবেচনায় থাকা উচিত।
কারণ কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে আমরা যেন এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি না করি, যেখানে অপরাধীকে ধরতে গিয়ে নিরপরাধকে অপরাধী বানিয়ে ফেলি; আর সেই নিরপরাধের ক্ষোভ, অপমান ও সামাজিক বঞ্চনা একদিন তাকে সত্যিকারের অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। তখন হয়তো প্রশ্ন উঠবে, সমাজে কীভাবে অপরাধী তৈরি হয়?
কিন্তু তার আগেই আমাদের প্রশ্ন করা উচিত, সে কি জন্মগতভাবে অপরাধী ছিল, নাকি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত, ভুল পরিচয় আর সামাজিক তিরস্কার তাকে সেই পথে ঠেলে দিয়েছিল? আর যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তাহলে সেই দায় শুধু ওই তরুণের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে আমরা কি নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারি?
কিশোর গ্যাং দমন করতে হবে, অবশ্যই। কিন্তু কোনো কিশোরের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে নয়। অপরাধীকে ধরতে হবে, নিরপরাধকে ফাঁসিয়ে নয়। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু কতজনকে আটক করা হলো, তা নয়। সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, প্রকৃত অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে একই সঙ্গে একজন নিরপরাধ নাগরিকের অধিকার, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎকে নিরাপদ রাখা।
লেখক: মেহেদী হাসান রিয়াদ, গণমাধ্যমকর্মী
kalprakash.com/IM