সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬ | ১৯ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ২২ রবিউস সানী, ১৪৪৮ | সকাল ১১:২৪:৪৩
শিরোনাম
● নাটোরে তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি, আটক ৩ ● দেবিদ্বারে দক্ষিণ গুনাইঘর ইউনিয়ন বিএনপির আলোচনা ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ● আবারো নতুন উদ্যমে চালু রাঙ্গুনিয়া এভিয়ারি এন্ড ইকো পার্ক ● যবিপ্রবিতে আন্তঃবিভাগ ফুটবল প্রতিযোগিতার উদ্বোধন ● ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে কিশোরীর মৃত্যু, দুই সাংবাদিক আহত ও ক্যামেরা ভাঙচুরের অভিযোগ ● ইতালিতে ১ লাখ ৬৬ হাজার কর্মী নেওয়ার ঘোষণা, আবেদন করবেন যেভাবে ● ভারতীয় নৌবাহিনীর গোপন তথ্য পাকিস্তানি গোয়েন্দার হাতে, হানিট্র্যাপে ধরা প্রদীপ মুখার্জি ● খাল থেকে অজ্ঞাত নারীর লাশ উদ্ধার ● পিরোজপুরে যুব উন্নয়নের ১৩১তম ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপ্ত ● দুর্গাপূজায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ে পুলিশের মতবিনিময় ● নাটোরে তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি, আটক ৩ ● দেবিদ্বারে দক্ষিণ গুনাইঘর ইউনিয়ন বিএনপির আলোচনা ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ● আবারো নতুন উদ্যমে চালু রাঙ্গুনিয়া এভিয়ারি এন্ড ইকো পার্ক ● যবিপ্রবিতে আন্তঃবিভাগ ফুটবল প্রতিযোগিতার উদ্বোধন ● ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে কিশোরীর মৃত্যু, দুই সাংবাদিক আহত ও ক্যামেরা ভাঙচুরের অভিযোগ ● ইতালিতে ১ লাখ ৬৬ হাজার কর্মী নেওয়ার ঘোষণা, আবেদন করবেন যেভাবে ● ভারতীয় নৌবাহিনীর গোপন তথ্য পাকিস্তানি গোয়েন্দার হাতে, হানিট্র্যাপে ধরা প্রদীপ মুখার্জি ● খাল থেকে অজ্ঞাত নারীর লাশ উদ্ধার ● পিরোজপুরে যুব উন্নয়নের ১৩১তম ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপ্ত ● দুর্গাপূজায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ে পুলিশের মতবিনিময়

মাতৃভাষার জন্য রক্ত: পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নির্মমতার ইতিহাস

মোহাম্মদ মিজান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
মোহাম্মদ মিজান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:১৪
শেয়ার: mail
মাতৃভাষার জন্য রক্ত: পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নির্মমতার ইতিহাস

পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি ও জনগোষ্ঠী ভাষার অধিকার ও মর্যাদার জন্য সংগ্রাম করেছে। তবে বাঙালির ভাষা আন্দোলন ইতিহাসে একটি বিশেষ ও রক্তাক্ত অধ্যায়। একটি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে অস্বীকার করা, তার পরিবর্তে অন্য একটি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা এবং সেই দাবির বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে নিরস্ত্র মানুষের প্রাণ হারানো—বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এসবই নির্মম বাস্তবতা। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন তাই কেবল ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ছিল না; এটি ছিল বাঙালির আত্মপরিচয়, অধিকার ও আত্মমর্যাদা রক্ষার আন্দোলন।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ভাষার প্রশ্নে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ভাষা ছিল বাংলা। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক শাসকগোষ্ঠী বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার পরিবর্তে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা চালায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষাকে উপেক্ষা করে একটি ভাষাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রাধান্য দেওয়ার এই নীতি বাঙালির মধ্যে গভীর অসন্তোষ সৃষ্টি করে এবং ধীরে ধীরে তা রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ নেয়।

এই ভাষানীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুখ ছিলেন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এসে তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থান নেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির ভাষার দাবিকে উপেক্ষা করা তাঁর এই অবস্থান পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এর কয়েক বছর পর, ১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। এতে ভাষার দাবিতে চলমান আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

এরপর আসে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ছাত্ররা রাজপথে নামে। আন্দোলন দমাতে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ সরকার ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু ছাত্রসমাজ সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাজপথে বেরিয়ে আসে। তাদের দাবি ছিল স্পষ্ট—বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে হবে। সেই মিছিলের ওপর পুলিশ গুলি চালায়। রফিকউদ্দীন আহমেদ, আবুল বরকত, আব্দুল জব্বার, আব্দুস সালাম, শফিউর রহমান ও আব্দুল আউয়ালউল্লা আউয়াল (আউয়াল উল্লাহ) শহীদ হন। পরবর্তী সময়েও ভাষার দাবিতে প্রাণহানি ঘটে।

সেদিন ঢাকার রাজপথে শুধু কয়েকজন তরুণের রক্ত ঝরেনি; রক্তাক্ত হয়েছিল একটি জাতির স্বপ্ন। যে তরুণেরা সকালে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন নিজের মায়ের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে, তাঁদের অনেকেই আর ঘরে ফিরতে পারেননি। কোনো মায়ের সন্তান, কোনো বাবার সন্তান, কোনো ভাই কিংবা বন্ধুর প্রিয় মানুষ সেদিন রাষ্ট্রীয় গুলির শিকার হয়ে চিরতরে হারিয়ে গেলেন। তাঁদের হাতে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না; ছিল ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি। অথচ সেই দাবির জবাব দেওয়া হয়েছিল গুলি দিয়ে। এই দৃশ্য বাঙালির জাতীয় স্মৃতিতে আজও গভীর বেদনার সঙ্গে বেঁচে আছে।

ভাষা আন্দোলনের এই রক্তপাতকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে ছিল তৎকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার বৈষম্যমূলক ভাষানীতি এবং সেই নীতি বাস্তবায়নের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ। জিন্নাহর উর্দু-প্রধান রাষ্ট্রভাষার অবস্থান, খাজা নাজিমুদ্দিনের একই নীতির পুনর্ব্যক্তি, ১৪৪ ধারা জারি এবং শেষ পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ—সবকিছু মিলে বাঙালির ভাষাগত অধিকারকে দমিয়ে রাখার একটি নির্মম রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল। এ কারণেই ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভূমিকা আজও কঠোর সমালোচনার বিষয়।

কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর সেই দমননীতি শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। তারা ভেবেছিল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আন্দোলন থামানো যাবে, রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করে ভাষার দাবি স্তব্ধ করা যাবে। বাস্তবে ঘটেছে তার উল্টো। শহীদদের রক্ত ভাষার দাবিকে আরও শক্তিশালী করেছে। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলা ও উর্দু—দুই ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ যে ভাষাকে একসময় রাষ্ট্রীয়ভাবে উপেক্ষা করা হয়েছিল, সেই ভাষাই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা অর্জন করে।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস শুধু ১৯৫২ সালের কয়েকটি দিনের ইতিহাস নয়। এটি বাঙালির জাতীয় চেতনা ও অধিকারবোধের বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ভাষার প্রশ্নে যে বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালি রাজপথে দাঁড়িয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেই অধিকারচেতনা আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক সংগ্রামের ভিত্তি তৈরি করে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন তাই বাঙালির জাতীয় ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।

এই ইতিহাস পরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও লাভ করে। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে এবং ২০০০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ফলে ঢাকার রাজপথে বাংলা ভাষার জন্য যে রক্ত ঝরেছিল, তার স্মৃতি আজ শুধু বাংলাদেশের নয়; এটি বিশ্বের মাতৃভাষাগুলোর অধিকার ও মর্যাদার সঙ্গেও যুক্ত একটি আন্তর্জাতিক স্মৃতি।

জিন্নাহ ও তাঁর পরবর্তী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভাষানীতি তাই বাঙালির ইতিহাসে কেবল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হয় না। এটি ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে যথাযথ মর্যাদা না দেওয়ার একটি বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় নীতির প্রতীক। সেই নীতির বিরুদ্ধে বাঙালি যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তার মূল্য ছিল তরুণদের রক্ত। কিন্তু সেই রক্তই শেষ পর্যন্ত বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার পথকে শক্তিশালী করে।

আজও ২১ ফেব্রুয়ারি এলে প্রশ্ন জাগে—কী অপরাধ ছিল বরকতের, রফিকের, জব্বারের, সালামের? তাঁদের অপরাধ ছিল না কোনো সহিংসতা; তাঁরা চেয়েছিলেন নিজের মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও মর্যাদা। সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতেই তাঁরা জীবন দিয়েছেন। তাঁদের আত্মত্যাগ তাই কেবল অতীতের একটি ঘটনা নয়; এটি আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক চিরন্তন স্মৃতি।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর গুলি বাংলা ভাষাকে থামাতে পারেনি। বরং সেই গুলির শব্দ ইতিহাসে পরিণত হয়েছে, আর শহীদদের রক্ত বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংগ্রামের প্রতীক হয়ে আছে। ভাষাশহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। বাংলা ভাষার প্রতি অঙ্গীকার। আর মাতৃভাষার অধিকার দমনের সেই বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় নীতির প্রতি ইতিহাসের চিরন্তন ধিক্কার।

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | Globe kalprakash.com

মাতৃভাষার জন্য রক্ত: পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নির্মমতার ইতিহাস

বিস্তারিত কমেন্টে