মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির মূল্যে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বাড়ার পূর্বাভাসকে কেন্দ্র করে ভারতীয় মুদ্রার এই অবমূল্যায়ন দেখা দিয়েছে।
সাম্প্রতিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের বিপরীতে রুপির মান শূন্য দশমিক চার শতাংশ কমে ৯৫ দশমিক ৯৬ রুপিতে দাঁড়িয়েছে। গত দুই মাসের মধ্যে এটি এক দিনে রুপির মূল্যের সবচেয়ে বড় পতন। এর আগের কার্যদিবসে প্রতি ডলারের বিপরীতে রুপির বিনিময়মূল্য ছিল ৯৫ দশমিক ৫৫ রুপি। এক দিনের ব্যবধানে দরপতনের পর রুপি এক মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়ার অন্যান্য দেশের মুদ্রার পাশাপাশি ভারতীয় রুপিরও এই দরপতন হয়েছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা ও অস্থিরতার জেরে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৭ দশমিক ৭০ ডলারে পৌঁছেছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন অকার্যকর হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে টান পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
চলতি মাসেই অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। ভারত তার জ্বালানি চাহিদার বড় একটি অংশ আমদানি করে থাকে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেশটির আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। পাশাপাশি ডলার সূচক বেড়ে ৯৯ দশমিক ৬০ পয়েন্টে পৌঁছানোও রুপির ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বাজারে ডলার বিক্রি করে রুপির পতনের গতি কিছুটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এ ছাড়া বাজারে রুপির তারল্যের ভারসাম্য বজায় রাখতে রিজার্ভ ব্যাংক টানা চতুর্থ দিনের মতো ডলার-রুপি সোয়াপ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।
রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা জানান, ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে অতিরিক্ত তারল্য শুষে নিতে ওপেন মার্কেট বন্ড বিক্রি ও বৈদেশিক মুদ্রা সোয়াপের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সেপ্টেম্বরেই অতিরিক্ত ১ ট্রিলিয়ন রুপি সমমূল্যের বন্ড বিক্রির পরিকল্পনাও ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে বিশ্বখ্যাত আর্থিক গবেষণা সংস্থা এমইউএফজি সতর্ক করে বলেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব পদক্ষেপ বাজারে রুপির তারল্য বাড়িয়ে উল্টো মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি পূর্বাভাস দিয়েছে, আগামীতে ডলারের বিপরীতে রুপির মান আরও কমতে পারে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতি ডলারের মূল্য ৯৫ দশমিক ৫০ রুপি এবং ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে ৯৬ দশমিক ৫০ রুপিতে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
তেলের আকাশচুম্বী দাম, মূল্যস্ফীতির শঙ্কা এবং মার্কিন ডলারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বৃদ্ধির কারণে ভারতের বন্ড মার্কেটেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার বেড়ে ৭ দশমিক ০৯ শতাংশে পৌঁছেছে।
সব মিলিয়ে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক অর্থবাজারের টানাপোড়েনে ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং আর্থিক বাজারে তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
kalprakash.com/IM