সৌদি আরবকে ঘিরে ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই নতুন করে আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবের পক্ষে ইয়েমেন সংঘাতে পাকিস্তান বা তুরস্ক সামরিকভাবে যুক্ত হলে তাদের বিরুদ্ধে ‘কঠোর ও নির্মম’ জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে হুথি গোষ্ঠী।
ইরাকি টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘অ্যানাদার রিডিং’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই হুমকি দেন হুথিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য ও ধামার প্রদেশের গভর্নর মোহাম্মদ আল-বুখাইতি।
তিনি বলেন, তুরস্ক ও পাকিস্তান ইয়েমেন সংঘাতে সামরিকভাবে জড়ালে হুথিরা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আঘাত হানবে। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, দুই দেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে ইয়েমেনের প্রতি সহানুভূতি রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হুঁশিয়ারিটি মূলত দুই দেশের সরকারের প্রতি।
হুথিদের হুঁশিয়ারির পেছনে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
চলতি বছরের ৭ আগস্ট তিন দেশ একটি ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তির আওতায় অংশীদার কোনো একটি দেশের ওপর হামলাকে সব পক্ষের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতি রাখা হয়েছে।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে যৌথ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোই চুক্তিটির অন্যতম লক্ষ্য বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো জানিয়েছে।
হুথিদের হুমকির মধ্যেই সৌদি আরবের প্রতি সমর্থনের কথা জানিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান।
তিনি বলেন, সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা গুরুতর হুমকির মুখে পড়েছে এবং প্রতিরক্ষা জোটের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তুরস্ক রিয়াদের পাশে রয়েছে।
হাকান ফিদানের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের সামরিক সহযোগিতার প্রয়োজন হতে পারে। এ বিষয়ে তুরস্ক পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা করবে এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলারও নিন্দা জানিয়েছেন তিনি।
হুথিদের হামলার শুরু থেকেই সৌদি আরবের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদ এসব হামলাকে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
সম্প্রতি মক্কার কাছে হামলার খবরের পর পাকিস্তানের অবস্থান আরও কঠোর হয়।
দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মক্কা ও মদিনার নিরাপত্তা রক্ষা পাকিস্তানের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী অঙ্গীকার ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরীও হারামাইন শরিফাইনের নিরাপত্তার বিষয়ে পাকিস্তানের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানান।
ইয়েমেনের বর্তমান সংঘাতের সূত্রপাত ২০১৪ সালে, যখন হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে। পরের বছর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে পুনর্বহালের লক্ষ্যে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি আরব জোট সামরিক হস্তক্ষেপ করে।
এরপর থেকে দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনে সংঘাত চলছে।
সাম্প্রতিক সময়ে হুথি ও সৌদি আরবের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা বেড়েছে। হুথিরা লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালিকে ঘিরে নিজেদের সামরিক তৎপরতা বাড়ানোর দাবি করেছে। পাশাপাশি সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ঘটনাও সামনে এসেছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং হুথিদের নতুন হুমকি ইয়েমেন সংঘাতের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
তবে পাকিস্তান বা তুরস্ক ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি। তুরস্কের পক্ষ থেকে সৌদি আরবকে সহযোগিতার সম্ভাবনার কথা বলা হলেও এর ধরনও নির্দিষ্ট করা হয়নি।
ফলে হুথিদের হুমকির পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ভর করবে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বাস্তব প্রয়োগ এবং পাকিস্তান ও তুরস্কের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
সূত্র: এক্সপ্রেস ট্রিবিউন
kalprakash.com/IM