গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে এক রাতেই অন্তত ৯০টি পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এর মধ্যে ১২টি পরিবারের সাতটি টিনের ঘর পুরোপুরি নদীগর্ভে চলে গেছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি পরিবারের ঘরের অংশবিশেষ বিলীন হয়েছে। আকস্মিক এ ভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে চরম মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। এদিকে নদীতীরবর্তী আরও দুই শতাধিক পরিবার যেকোনো মুহূর্তে ভিটেমাটি হারানোর তীব্র আতঙ্কে দিনাতিপাত করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সিংগীজানি ও লালচামার এলাকায় তিস্তার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ৩টার দিকে হঠাৎ ভাঙনের তীব্রতা বাড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই প্রায় ৭০টি পরিবারের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে চলে যায়। পরদিন বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুর পর্যন্ত আরও বেশ কয়েকটি পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে তলিয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত কয়েক দিন ধরে তিস্তার পানি কমলেও বুধবার রাত থেকে পানি পুনরায় কিছুটা বাড়তে শুরু করে। এরপরই আকস্মিক ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। চলতি বর্ষা মৌসুমে এ এলাকায় অন্তত চার দফায় ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনে বসতঘরের পাশাপাশি বহু গাছপালা, হাঁস-মুরগির খামার ও আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন মূল্যবান মালামাল নদীতে ভেসে গেছে। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার ন্যূনতম সুযোগটুকুও পায়নি।
এর আগে গত ১৮ আগস্ট তিস্তার অব্যাহত ভাঙনে চরাঞ্চলের শিশুদের একমাত্র বিদ্যাপীঠ ‘ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। বিদ্যালয়টি নদীতে চলে যাওয়ার পরদিন ১৯ আগস্ট সেখানে ভাঙন প্রতিরোধে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করেছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়টি রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা একাধিকবার এলাকা পরিদর্শন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পরিদর্শনে এসে আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত বিদ্যালয়টি রক্ষা করা যায়নি।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করেন। এ সময় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির নির্দেশ দেন।
এদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক মো. মাজেদুর রহমানের নির্দেশনায় ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে।
ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। এ সময় উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো. সামিউল ইসলামসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে রান্না করা খাবার বিতরণ করেন। পাশাপাশি উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. মাহমুদুল ইসলাম প্রামাণিকের নেতৃত্বে দলীয় নেতাকর্মীরা ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানান।
কাপাসিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য হাবিজার রহমান বলেন, “বর্ষা শুরুর পর থেকেই এলাকায় ভাঙন চলছে। ইতোমধ্যে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ শতাধিক পরিবার তাদের বসতভিটা হারিয়েছে। এখনো দুই শতাধিক পরিবার মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। পর্যাপ্ত জিও ব্যাগ ফেলা হলে হয়তো ভাঙন ঠেকানো সম্ভব হবে।”
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, “ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর খোঁজ নেওয়া হয়েছে এবং জরুরি ভিত্তিতে শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে; তালিকা অনুযায়ী সরকারি বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে। পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ভাঙন প্রতিরোধে জিও ব্যাগ ফেলার কার্যক্রম চলছে।”
গাইবান্ধা জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম জানান, ভাঙন শুরু হওয়ার পরপরই জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করা হয়েছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও জিও ব্যাগ ফেলা হবে।
kalprakash.com/IM