এক সময় গ্রামবাংলার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল ঢেঁকি। এর ছন্দময় শব্দে মুখরিত থাকত পাড়া-মহল্লা। কিন্তু আধুনিক যন্ত্রচালিত প্রযুক্তির প্রসারে ঐতিহ্যবাহী এই ঢেঁকি এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার করে প্রাচীন এ ঐতিহ্যকে নতুন রূপে ফিরিয়ে এনেছেন অনেক উদ্যোক্তা। পারিবারিক ব্যবহারের গণ্ডি পেরিয়ে এখন এটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ হিসেবেও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার নালী ইউনিয়নের কুন্দুরিয়া গ্রামের অবাক মার্কেটে ‘ঢেঁকি ঘর’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন উদ্যোক্তা মো. আকতার হোসেন। সেখানে তিনি ঢেঁকিছাঁটা আমন ও আউশ ধানের ফরমালিনমুক্ত লাল চাল বিক্রি করছেন।
মো. আকতার হোসেন জানান, ২০২০ সালে তিনি হৃদরোগ, জন্ডিস ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় চিকিৎসক রামপ্রসাদ সরকার তাকে আমন ও আউশ ধানের লাল চালের ভাত খাওয়ার পরামর্শ দেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত লাল চালের ভাত খাওয়ার পর তিনি সুস্থতা ফিরে পান। এরপর থেকেই স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের জন্য ঢেঁকিছাঁটা লাল চাল উৎপাদন ও বাজারজাত করার উদ্যোগ নেন।
তিনি আরও জানান, তার প্রতিষ্ঠানে শুধু লাল চাল নয়, আতপ চাল প্রস্তুতকরণ, হলুদ ও মরিচ ভাঙানোর ব্যবস্থাও রয়েছে।
স্থানীয়রা বলেন, আকতার হোসেন ছোটবেলা থেকেই সৎ, মিতব্যয়ী, স্পষ্টভাষী ও পরিশ্রমী মানুষ হিসেবে পরিচিত। তার এই উদ্যোগ ঐতিহ্য ও প্রযুক্তির এক চমৎকার সমন্বয়।
জানা যায়, বিদ্যুৎচালিত মোটরের সাহায্যে তার দুটি কাঠের ঢেঁকি সচল রাখা হয়েছে। প্রায় পাঁচ ফুট দৈর্ঘ্যের ঢেঁকিগুলো চার হর্সপাওয়ারের মোটরের সঙ্গে সংযুক্ত করে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচালনা করা হচ্ছে।
ঘিওর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী হেলাচিয়া মাজেদা চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কবি মো. মাসুদুল ইসলাম মাসুদ বলেন, “সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে আকতার হোসেন সবসময় বিপন্ন ও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ান। তার বাবা নালী ইউনিয়ন পরিষদের একজন আদর্শ জনপ্রতিনিধি ছিলেন। আকতার হোসেনের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।”
ঢেঁকি ঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক মো. আকতার হোসেন বলেন, “ধান সংগ্রহের জন্য আমাকে বাইরের জেলায় যেতে হয় না। মানিকগঞ্জেই প্রচুর ধান উৎপাদিত হয়। এখানকার কৃষকদের কাছ থেকেই ধান সংগ্রহ করি।”
তিনি জানান, বর্তমানে প্রতি কেজি আমন ও আউশ ধানের ঢেঁকিছাঁটা লাল চাল ১০০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে।
স্থানীয় বিশিষ্টজনরা মনে করেন, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে গ্রামীণ ঐতিহ্যের সমন্বয়ে আকতার হোসেনের এই উদ্যোগ শুধু ব্যবসায়িক সফলতার উদাহরণ নয়, বরং হারিয়ে যেতে বসা একটি ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তোলারও একটি কার্যকর প্রয়াস।কুন্দুরিয়া ঢেঁকি ঘরে
মানিকগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি 






















