সভ্যতার অগ্রযাত্রায় মানুষ আজ অভূতপূর্ব সাফল্যের অধিকারী। বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কার পৃথিবীকে মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। মুহূর্তেই এক মহাদেশের মানুষ আরেক মহাদেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে। প্রযুক্তি আকাশ ছুঁয়েছে, সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছে জ্ঞান ও তথ্যের প্রবাহ। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—মানুষ কি সত্যিই শান্তিতে আছে? উন্নত প্রযুক্তির পাশাপাশি কেন বাড়ছে যুদ্ধ, হিংসা, অন্যায়, দুর্নীতি, বৈষম্য ও অস্থিরতা? মানুষের হাতে এত কিছু থাকার পরও কেন হৃদয়ে এত অশান্তি?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে এমন একজন মহামানবের জীবনের দিকে, যাঁর আগমনে শুধু একটি জাতির ইতিহাস বদলায়নি, বদলে দিয়েছিল মানবসভ্যতার গতিপথ। তিনি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)—মানবতার শিক্ষক, ন্যায় ও শান্তির দূত এবং বিশ্ববাসীর জন্য অনুপম আদর্শ।
মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনের আগে আরব সমাজ ছিল গভীর নৈতিক ও সামাজিক অন্ধকারে নিমজ্জিত। গোত্রীয় অহংকার, প্রতিহিংসা, রক্তপাত, মদ, জুয়া, সুদ, ব্যভিচার, দুর্বলদের ওপর নির্যাতন এবং কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নির্মমতা সমাজের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছিল। সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর যুদ্ধ চলত। এমন অন্ধকার সমাজেই মহানবী (সা.)-এর আবির্ভাব ঘটে।
তিনি শুধু কিছু ধর্মীয় বিধান প্রচার করেননি; মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও জীবনব্যবস্থায় এমন এক বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, যার ফলে একটি বিভক্ত ও সংঘাতপূর্ণ সমাজ ন্যায়, শৃঙ্খলা, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার ভিত্তিতে নতুন রূপ লাভ করে। যারা পরস্পরের রক্তের পিপাসু ছিল, তারা পরিণত হয়েছিল পরস্পরের ভাইয়ে। যারা বংশ ও গোত্রের অহংকারে বিভক্ত ছিল, তারা একত্রিত হয়েছিল ঈমান ও মানবতার বন্ধনে।
পবিত্র কোরআন তাঁর জীবনকে শুধু তাঁর সময়ের মানুষের জন্য নয়, সব যুগের মানুষের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে ঘোষণা করেছে—
‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ’ (সুরা আল-আহজাব : ২১)।
এই একটি আয়াতেই মহানবী (সা.)-এর আদর্শের সর্বজনীনতা স্পষ্ট হয়ে যায়। তিনি কোনো একটি শ্রেণির মানুষকে আদর্শ দেওয়ার জন্য আসেননি। জীবনের যে অবস্থাতেই মানুষ থাকুক, তাঁর জীবন থেকে সে পথনির্দেশ গ্রহণ করতে পারে।
তিনি ছিলেন একজন স্বামী—তাঁর দাম্পত্যজীবনে ছিল ভালোবাসা, বিশ্বস্ততা, সৌজন্য ও দায়িত্ববোধ। পিতা হিসেবে সন্তানদের প্রতি তাঁর আচরণে ফুটে উঠেছিল গভীর মমতা। নানা হিসেবে হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর প্রতি তাঁর স্নেহ ছিল অসাধারণ।
ব্যবসায়ী হিসেবে সততা ও আমানতদারিতার কারণে মক্কার মানুষ তাঁকে ‘আল-আমিন’ বলে অভিহিত করত। তাঁর শিক্ষাদানের পদ্ধতিতে ছিল প্রজ্ঞা, কোমলতা ও মানুষের সামর্থ্য বিবেচনার অসাধারণ দৃষ্টান্ত। প্রতিপক্ষের বিরোধিতার মধ্যেও তিনি ধৈর্য ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন।
সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধের ময়দানেও তিনি ন্যায়নীতি ও মানবিকতার সীমারেখা অতিক্রম করেননি। আর মদিনায় রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাঁর শাসনে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ন্যায়বিচার, নাগরিক নিরাপত্তা, সামাজিক দায়িত্ব ও ধর্মীয় সহাবস্থানের অনন্য দৃষ্টান্ত।
আজকের পৃথিবীর সংকটগুলো গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, মহানবী (সা.)-এর আদর্শ কতটা প্রাসঙ্গিক। পরিবারে সম্পর্কের টানাপোড়েন, সমাজে অসহিষ্ণুতা, ব্যবসায় প্রতারণা, রাজনীতিতে সংঘাত, রাষ্ট্রে দুর্নীতি, দুর্বলদের অধিকার হরণ—এসবের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর জীবন আমাদের সুস্পষ্ট নীতিমালা দেয়।
তিনি শিখিয়েছেন, ক্ষমতা দায়িত্ব, সম্পদ আমানত, প্রতিবেশীর অধিকার আছে, দুর্বল মানুষের মর্যাদা আছে, শ্রমিকের অধিকার আছে এবং ন্যায়বিচার আত্মীয়স্বজনের পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে।
লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, বসুন্ধরা, ঢাকা
kalprakash.com/IM