রাজধানীতে মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের বিশেষ অভিযান চলছে। নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি প্রতিদিন গড়ে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করছে পুলিশ। তবে ব্যাপক এই ধরপাকড়ের মধ্যেও কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পসহ রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে প্রকাশ্যে চলছে মাদক বেচাকেনা।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বিশেষ অভিযানে গত এক মাসে বিভিন্ন অভিযোগে ১৫ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চিহ্নিত মাদক কারবারি রয়েছে। সর্বশেষ শুক্রবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ৫৪২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিভাগওয়ারি হিসেবে মিরপুর বিভাগে সর্বাধিক ১৯৩ জন, তেজগাঁওয়ে ৯১, ওয়ারীতে ৬০, মতিঝিলে ৫২, উত্তরায় ৪২, গুলশানে ৪১, লালবাগে ২৮, রমনায় ২২, গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) ১২ এবং কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের অভিযানে একজন গ্রেপ্তার হন। এসব ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ৫১টি মামলা করা হয়েছে।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার মো. আকতার হোসেন জানান, ২৪ ঘণ্টার অভিযানে ৩ হাজার ২৯১টি ইয়াবা, ৪৫ কেজি ৪৯০ গ্রাম গাঁজা, একটি শটগানসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে চার শতাধিক শীর্ষ মাদক কারবারি সক্রিয় রয়েছে, যারা মূলত বিভিন্ন অঞ্চলের মাদক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। তালিকাভুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। পুলিশের তালিকায় থাকা শীর্ষ কারবারি মো. দিলদার ও তার সহযোগী শাকিরসহ অন্তত ৩৫ জন নিয়মিত সীমান্ত অঞ্চল থেকে মাদক এনে ঢাকায় সরবরাহ করছে।
এদিকে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প ঘিরে রয়েছে অন্তত ১১ জন শীর্ষ মাদক গডফাদার। তারা হলো মনু ওরফে গালকাটা মনু, সালাম, ইরফান, লালন, শাহজাদা, ফারদিন, বড় রাজা, আদিল, কামরান, কাদির ও ইমতিয়াজ। তাদের দুই শতাধিক সহযোগী ক্যাম্পের হুমায়ূন রোডসহ ১২টি স্পটে নিয়মিত মাদক বিক্রি করে। ডিএমপি এলাকায় মাদক বিক্রির এমন চার শতাধিক স্পটের তথ্য রয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে।
সরেজমিনে কারওয়ান বাজার রেলগেট, মোহাম্মদপুর বিহারি ক্যাম্প, মগবাজার রেলগেট, পল্লবী, খিলগাঁও ওহাব কলোনি এবং উত্তর বাড্ডাসহ বেশ কিছু এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির চিত্র দেখা গেছে। কারওয়ান বাজার রেলগেট এলাকায় কিশোর ও তরুণদের দলবদ্ধভাবে ঘুরে ঘুরে ক্রেতাদের কাছে ইয়াবা বিক্রি করতে দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলে এসেও ক্রেতারা দ্রুত মাদক নিয়ে চলে যাচ্ছেন। অন্যদিকে জেনেভা ক্যাম্পের চারপাশে একাধিক পুলিশ চেকপোস্ট এবং যৌথ বাহিনীর নিয়মিত অভিযান থাকা সত্ত্বেও গলির ভেতরে প্রকাশ্যে সব ধরনের মাদক কেনাবেচা চলছে।
পুলিশের দাবি, ক্যাম্পের একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই কারবারে জড়িয়ে পড়েছে। তবে ক্যাম্পের বাসিন্দাদের মতে, চরম দারিদ্র্য ও বেকারত্বের সুযোগ নিয়েই স্থানীয় মাদক চক্র এই কারবার টিকিয়ে রেখেছে।
এ বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ রাজধানীতে মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির নির্দেশ দিয়েছেন। থানার ওসিসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়মিত ঘটনাস্থল পরিদর্শনের নির্দেশ দিয়ে তিনি সতর্ক করেন, কোনো পুলিশ সদস্যের দায়িত্ব পালনে অবহেলা পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং এবং সাইবার অপরাধ দমনে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি স্পষ্ট জানান।
kalprakash.com/IM