কক্সবাজারের ইনানী জাতীয় উদ্যানে প্রথমবারের মতো ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়েছে বিরল ও বিপন্ন বন্যপ্রাণী ‘মেঘলা চিতা’। টানা ১৩ মাসের এক গবেষণায় বনের তিনটি ক্যামেরায় প্রাণীটির পাঁচটি ছবি ধরা পড়ে। শুধু মেঘলা চিতাই নয়, এ গবেষণায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলটিতে আরও ২১ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন গবেষকরা। বন উজাড়, দখল ও মানবসৃষ্ট নানামুখী চাপের মধ্যেও এই আবিষ্কার কক্সবাজারের বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
চলতি মাসের শুরুতে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘গ্লোবাল ইকোলজি অ্যান্ড কনজারভেশন’-এ এ সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়।
গবেষক দলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ইনানী জাতীয় উদ্যানের ৩২টি স্থানে ১৫টি ক্যামেরা বসিয়ে বন্যপ্রাণীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে তিনটি ক্যামেরায় মেঘলা চিতার পাঁচটি ছবি ধরা পড়ে। পাশাপাশি পায়ের ছাপ ও মল পরীক্ষা করেও প্রাণীটির উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়।
বন অধিদপ্তরের বাংলাদেশ ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টারের পরিচালক ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিপুল কৃষ্ণ দাস জানান, ইনানী জাতীয় উদ্যানের মোট আয়তন ৭ হাজার ৮৫ হেক্টর। গবেষণায় দেখা গেছে, এর প্রায় ৩ হাজার হেক্টর এলাকা মেঘলা চিতার বসবাসের উপযোগী; অর্থাৎ উদ্যানের প্রায় ৪৪ শতাংশ এলাকা প্রাণীটির উপযুক্ত আবাসস্থল। গবেষকরা জানান, গাছের সঙ্গে থাকা ঘন ঝোপঝাড়সমৃদ্ধ এলাকায় মেঘলা চিতার বিচরণ বেশি। এ ধরনের বনাঞ্চলের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৮৮৭ হেক্টর। এছাড়া যেখানে জলাশয়, পাহাড়ি ছড়া ও পানির প্রবাহ রয়েছে, সেসব এলাকায় অন্যান্য অংশের তুলনায় বন্যপ্রাণীর উপস্থিতিও বেশি লক্ষ্য করা গেছে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনভূমিতে বিচরণকারী মাঝারি আকারের এই মাংসাশী প্রাণীর শরীরে মেঘের মতো বড় বড় ছোপ থাকায় এর নাম ‘মেঘলা চিতা’। দিনের অধিকাংশ সময় গাছের ডালে কাটানো এই প্রাণীর প্রধান শিকারের মধ্যে রয়েছে বানর, পাখি ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী। বৃক্ষবাসী জীবনযাপনের কারণে প্রাণীটির গোড়ালির সন্ধি অত্যন্ত নমনীয়, যা ১৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঘুরতে পারে। ফলে গাছের খাড়া কাণ্ড বেয়ে মাথা নিচের দিকে রেখেও অবলীলায় নেমে আসতে পারে এটি।
প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের জাতীয় পর্যায়ের মূল্যায়নে বাংলাদেশে মেঘলা চিতাকে ‘মহাবিপন্ন’ এবং বৈশ্বিক লাল তালিকায় ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বন্যপ্রাণী গবেষকদের মতে, ইনানীর বনে মেঘলা চিতার উপস্থিতি প্রমাণ করে বনটি এখনো সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্র ধরে রেখেছে। তাই অবিলম্বে প্রাণীটির আবাসস্থল চিহ্নিত করে বিশেষ সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেওয়া এবং বনাঞ্চলে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও বসতি উচ্ছেদ করা জরুরি।
মেঘলা চিতার পাশাপাশি এ গবেষণায় ইনানী জাতীয় উদ্যানে আরও ২১ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে এশিয়ান হাতি, মুখপোড়া হনুমান, উল্টোলেজি বানর, লজ্জাবতী বানর, রেসাস মেকাক, শজারু, শিয়াল, গন্ধগোকুল, ছোট ও বড় খাটাশ, বনবিড়াল, চিতা বিড়াল, বন্য শূকর, কাঁকড়াভুক বেজি, গোরখোদক, ইরাবতী কাঠবিড়ালি, গেছো ছুঁচো, মায়া হরিণ, দাঁতাল ফেরেট বেজার, ছোট রক্তপেকো বাদুড়, বাদামি কাঠবিড়ালি ও লাল উড়ন্ত কাঠবিড়ালি।
গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছে বন অধিদপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ এবং জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব গ্যোটিঙেন।
গবেষকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সম্প্রসারণ, মানুষের বসতি, গাছ কেটে জ্বালানি সংগ্রহ ও কৃষিজমির কারণে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল মারাত্মকভাবে সংকুচিত হচ্ছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ইনানী বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ভবিষ্যতে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। বনাঞ্চল রক্ষায় অবিলম্বে দখল ও অনুপ্রবেশ বন্ধ, পাহাড়ি ছড়া সংরক্ষণ, বাফার জোন তৈরি এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
kalprakash.com/IM