সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের ফিডে বিপজ্জনক ও বিভাজনমূলক কনটেন্ট ঠেলে দেওয়া শক্তিশালী অ্যালগরিদম থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দিতে নতুন আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া। অনলাইন নিরাপত্তা বাড়ানোর অংশ হিসেবে এই নতুন নিয়ম চালু করা হবে। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন আইনের আওতায় ১৬ বছরের বেশি বয়সী ব্যবহারকারীদের অ্যালগরিদম-নির্ভর কনটেন্ট বন্ধ করার বিকল্প সুবিধা দেওয়া হবে। কোনো প্ল্যাটফর্ম এই নিয়ম অমান্য করলে তাদের ১০ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলারেরও বেশি জরিমানা হতে পারে।
‘মাই ফিড, মাই ওয়ে’ নামে পরিচিত এই পরিকল্পনার অধীনে কোনো ব্যবহারকারী অ্যালগরিদম বন্ধ করে দিলে তাঁর ফিডে কেবল সেসব ব্যক্তি ও পেজ বা গ্রুপের কনটেন্ট প্রদর্শিত হবে, যাদের তিনি নিজে সক্রিয়ভাবে অনুসরণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের একটি পপ-আপ বার্তার মাধ্যমে জিজ্ঞেস করা হবে—তাঁরা ডিফল্ট ফিডে কী ধরনের কনটেন্ট দেখতে চান।
শিশুদের সুরক্ষায় কঠোর বিধিনিষেধ ১৮ বছরের কম বয়সী সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের জন্য প্রস্তাবিত ‘ডিজিটাল ডিউটি অব কেয়ার’ আইন অনুযায়ী শুধু সোশ্যাল মিডিয়া নয়, অনলাইন গেম, মোবাইল অ্যাপ এবং এআই চ্যাটবটকেও শিশুদের নির্দিষ্ট কিছু ক্ষতি থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এর মধ্যে রয়েছে—পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট, ইটিং ডিসঅর্ডারকে উৎসাহিত বা প্রচার করে এমন কনটেন্ট, নারীবিদ্বেষী বিষয়বস্তু, অপরাধকে মহিমান্বিত করা কনটেন্ট, ঝুঁকিপূর্ণ স্টান্টকে উৎসাহিত করা কনটেন্ট এবং তীব্র মানসিক চাপ, নির্যাতন ও অনলাইন বুলিং সৃষ্টি করে এমন কনটেন্ট।
অস্ট্রেলিয়ার অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘ইসেফটি কমিশনার’ সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে যেকোনো ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণের নির্দেশ দিতে পারবে। পাশাপাশি প্ল্যাটফর্ম পরিচালনাকারীদের অনলাইন ক্ষতি মোকাবিলায় নেওয়া পদক্ষেপের যথাযথ নথিও সংরক্ষণ করতে হবে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ চলতি মাসের শেষ দিকে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এই পরিকল্পনাগুলো তুলে ধরবেন বলে আশা করা হচ্ছে। অ্যালবানিজ বলেন, ‘এটি সরকারকে নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার বিষয় নয়; বরং মানুষকে নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার বিষয়।’
বড় প্রযুক্তি কোম্পানি ও তাদের মালিকদের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের আশঙ্কাও তিনি উড়িয়ে দিয়েছেন। উল্লেখ্য, এসব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অনেক উদ্যোক্তার সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
তবে এই আইন পার্লামেন্টে পাস করাতে ক্ষমতাসীন লেবার সরকারকে গ্রিনস পার্টির সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হবে। প্রধান বিরোধী দল লিবারেল ও ন্যাশনাল পার্টি ইতোমধ্যে বিরোধিতার ইঙ্গিত দিয়ে অভিযোগ করেছে, সরকার ইন্টারনেটে সেন্সরশিপের দিকে এগোচ্ছে।
বিরোধিতা প্রসঙ্গে অ্যালবানিজ বলেন, এই উদ্যোগের বিরোধিতা অবশ্যই হবে, কারণ এর মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বড় বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নিয়ে সাধারণ অস্ট্রেলিয়ান নাগরিকদের হাতে তুলে দিতে চাইছে সরকার—এবং এটিই সঠিক পদক্ষেপ।
যোগাযোগমন্ত্রী আনিকা ওয়েলস বলেন, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে অস্ট্রেলিয়ান ব্যবহারকারীদের ওপর কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই বাস্তব সময়ে নানা পণ্যের পরীক্ষা চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘বিগ টেকের বিরুদ্ধে বৈশ্বিকভাবে পরিবর্তনের বার্তা আসছে এবং এর সূচনা হয়েছে অস্ট্রেলিয়ায়।’
অস্ট্রেলিয়া ইতোমধ্যে শিশুদের জন্য বিশ্বের অন্যতম কঠোর সোশ্যাল মিডিয়া বয়সসীমা আইন চালু করেছে। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও নিউজিল্যান্ডসহ আরও কয়েকটি দেশ শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে একই ধরনের বিধিনিষেধ জারির পথে এগোচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় দেখা গেছে, অস্ট্রেলিয়ায় গত ডিসেম্বরে চালু হওয়া এ ব্যবস্থা শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি এবং এর কার্যকারিতা আংশিক প্রমাণিত হয়েছে।
kalprakash.com/IM