হিন্দু ধর্মীয় একটি প্রতিনিধিদলের পরিদর্শনের সময় নারীকর্মীদের কর্মস্থল থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে কর্মীদের ধর্মঘটের মুখে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে ফ্রান্সের ঐতিহাসিক আইফেল টাওয়ার। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) থেকে দর্শনার্থীদের জন্য প্যারিসের বিখ্যাত এই স্থাপনাটি বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ ও কর্মী ইউনিয়ন।
গত শনিবার বোচাসানওয়াসি আকসার পুরুষোত্তম স্বামিনারায়ণ সংস্থার (বিএপিএস) সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১০০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল আইফেল টাওয়ার পরিদর্শনে যায়।
আইফেল টাওয়ার কর্মী ইউনিয়নের প্রতিনিধি ডায়ান ডেভয়েন জানান, প্রতিনিধিদলটি পৌঁছানোর পর সেখানে কর্মরত নারীদের স্থান পরিবর্তন করতে বলা হয়। রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘এই প্রতিনিধিদলের পরিদর্শনের সময় নারীকর্মীদের তাদের নির্ধারিত দায়িত্বস্থল ছেড়ে চলে যেতে বলা হয় এবং সেখানে কেবল পুরুষদের রাখা হয়।’
ডেভয়েন জানান, এ ঘটনায় কর্মীরা—বিশেষ করে নারী সহকর্মীরা চরম অপমানিত বোধ করেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পরবর্তীতে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কর্মীদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনাও করে। তবে কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের প্রতিবাদে এবং তীব্র ক্ষোভ থেকে সোমবার কর্মীরা জরুরি বৈঠক ডেকে ধর্মঘটে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।
আইফেল টাওয়ার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সোসিয়েতে দ’এক্সপ্লোয়াসিওঁ দে লা তুর আইফেল (সেতে) জানিয়েছে, বিএপিএস প্রতিনিধিদল পরিদর্শনের সময় নারীদের সঙ্গে মেলামেশা সীমিত রাখার বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটি স্পষ্ট করেছে, এ ধরনের অনুরোধ তাদের প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধ এবং নারী-পুরুষের সমতার নীতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। সেতের প্রেসিডেন্ট অ্যারিয়েল ওয়েল ঘটনাটিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করে নারী-পুরুষের সমতার প্রতি আইফেল টাওয়ার কর্তৃপক্ষের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
এদিকে বিএপিএসের প্যারিস শাখা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সাধারণ দর্শনার্থীদের যেন কোনো ব্যাঘাত না ঘটে, সে জন্য আইফেল টাওয়ার কর্তৃপক্ষের সার্বিক সহযোগিতায় টাওয়ার খোলার নির্ধারিত সময়ের শুরুতে তাদের সফরের আয়োজন করা হয়েছিল। এই সফরের কারণে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে থাকলে তারা আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি নিজেদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সেবার সর্বজনীন মূল্যবোধে বিশ্বাসী বলেও দাবি করেছে। উল্লেখ্য, গত রবিবার প্যারিসের একটি উপশহরে ফ্রান্সে বিএপিএসের প্রথম বৃহৎ উপাসনালয় উদ্বোধন করা হয়। বিশ্বজুড়ে লন্ডন, লস অ্যাঞ্জেলেস ও সিডনিসহ বিভিন্ন শহরে তাদের মন্দির রয়েছে।
ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে আনুষ্ঠানিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার। নারীকর্মীদের ক্ষোভকে ‘সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নারী ও পুরুষের সমতার মূলনীতি প্যারিসের কোনো স্থানেই ক্ষুণ্ণ হতে দেওয়া যাবে না।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সের রাজনৈতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। কট্টর ডানপন্থী নেত্রী মারিন ল্য পেন বলেন, ফ্রান্সে নারীদের উপস্থিতি সীমিত করার যেকোনো অপচেষ্টা শক্ত হাতে প্রতিহত করা হবে। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী গ্যাব্রিয়েল আটালও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কোনো সংস্কৃতি, ধর্ম বা বিশ্বাস নারীদের অবস্থান কোথায় হবে তা নির্ধারণ করতে পারে না। একই সঙ্গে ফরাসি জাতীয় পরিষদের সভাপতি ইয়েল ব্রাউন-পিভে বিদেশি দর্শনার্থীদের দাবির মুখে নারীকর্মীদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে অগ্রহণযোগ্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
kalprakash.com/IM