জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের রাজ্য নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে কট্টর ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)। একটি রাজ্যের নির্বাচনী ফলাফল হলেও ইউরোপের রাজনৈতিক অঙ্গনে এটিকে সুদূরপ্রসারী বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের আশঙ্কা, জার্মানিতে এএফডির এই সাফল্য আগামী বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থীদের আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার পথ সুগম করতে পারে।
রোববারের নির্বাচনে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের নেতৃত্বাধীন মধ্য-ডানপন্থী ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নকে (সিডিইউ) বড় ব্যবধানে পেছনে ফেলেছে এএফডি। তবে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় আসন না থাকায় সর্বোচ্চ ভোট পেয়েও দলটির সরকার গঠনের পথ সহজ নয়।
জার্মানির প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এখনো এএফডির সঙ্গে জোট গঠনে অনীহা প্রকাশ করে আসছে। দলটির একাধিক নেতার বিরুদ্ধে নাৎসি স্লোগান ব্যবহার এবং হলোকাস্টের ঐতিহাসিক গুরুত্ব খাটো করে দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থাও দলটিকে চরমপন্থী হিসেবে নজরদারিতে রেখেছে। এছাড়া অভিবাসী পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে দলটির কঠোর অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়ে আসছে।
নানা বিতর্ক সত্ত্বেও এএফডির এই নির্বাচনী সাফল্য জার্মানির জাতীয় রাজনীতিতে সুস্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে তৈরি হওয়া অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে সমর্থন বাড়িয়েছে দলটি।
এ ফলাফল চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের জন্যও বড় ধরনের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এএফডির তুলনায় সিডিইউ অর্ধেকেরও কম ভোট পাওয়ায় খোদ দলের ভেতর থেকেই নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এমনিতেই অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মের্ৎসের অবস্থান আগের চেয়ে দুর্বল হয়েছে; পাশাপাশি ইউরোপীয় নীতি নির্ধারণে জার্মানির প্রভাবও কিছুটা হ্রাস পেয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রশাসনে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষক মুজতবা রহমানের মতে, ইউরোপের উন্নত দেশগুলো বর্তমানে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় কার্যকারিতার সংকটে ভুগছে। জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, অর্থনৈতিক চাপ এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার সুযোগ নিচ্ছে কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলো।
জার্মানির এই ফলাফল এমন এক প্রেক্ষাপটে সামনে এলো, যখন পুরো ইউরোপ জুড়েই কট্টর ডানপন্থীদের প্রভাব বাড়ছে। অভিবাসন বিরোধিতা, জাতীয়তাবাদী পরিচয়, জীবনযাত্রার সংকট ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে সামনে এনে ভোটারদের আস্থা আদায়ের চেষ্টা করছে এসব দল। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের জাতীয়তাবাদী বক্তব্যের সঙ্গে এএফডির রাজনৈতিক কৌশলের উল্লেখযোগ্য মিল লক্ষ্য করা যায়।
আগামী বছর ইউরোপের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে বসন্তে ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, আগস্টের মধ্যে স্পেনে সাধারণ নির্বাচন এবং বছরের শেষ নাগাদ ইতালিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনটি দেশেই কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ও নেতাদের জনসমর্থন ঊর্ধ্বমুখী।
জার্মানির পর ইউরোপের রাজনৈতিক দৃষ্টি এখন ফ্রান্সের দিকে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁর মেয়াদ শেষে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালির নেত্রী মারিন লে পেন অত্যন্ত শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। বিভিন্ন জনমত জরিপে প্রথম দফার লড়াইয়ে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে বেশ এগিয়ে আছেন।
গত ১৪ বছর ধরে প্রেসিডেন্ট হওয়ার দৌড়ে থাকা লে পেন এবার আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ক্ষমতার সবচেয়ে কাছাকাছি রয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। ফ্রান্সে কট্টর ডানপন্থীরা ক্ষমতায় এলে এর অভিঘাত দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে সমগ্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্থিতিশীলতা ও নীতি নির্ধারণে বড় ধরনের ঝাঁকুনি তৈরি করতে পারে। পারমাণবিক শক্তিধর এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে ফ্রান্সে রাজনৈতিক পালাবদল প্রচলিত ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় রদবদল ঘটাবে।
ঐতিহাসিকভাবে ফ্রান্স ও জার্মানির মূলধারার দলগুলো কট্টর ডানপন্থীদের ঠেকাতে জোট গঠনের কৌশল নিয়ে আসছে, যা ফরাসি রাজনীতিতে ‘কর্দোঁ সানিতের’ বা রাজনৈতিক বাধার প্রাচীর হিসেবে পরিচিত। তবে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ফরাসি ও ইউরোপীয় রাজনীতির অধ্যাপক ফিলিপ মারলিয়েরের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্যাসিবাদবিরোধী যে ঐকমত্যের ওপর ভিত্তি করে ইউরোপীয় রাজনীতি গড়ে উঠেছিল, তা এখন নজিরবিহীন চাপের মুখে পড়েছে।
এএফডির এই বিজয় ইউরোপীয় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। একপক্ষের মতে, কট্টর ডানপন্থীদের উত্থান গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও বহুত্ববাদের জন্য হুমকি। অন্যদিকে তাদের সমর্থকদের দাবি, মূলধারার দলগুলোর নীতিগত ব্যর্থতা ও অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই প্রতিফলন ঘটছে এই দলগুলোর মাধ্যমে।
সমালোচকদের আশঙ্কা, কট্টর ডানপন্থীরা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এলে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য দুর্বল হতে পারে এবং অভিবাসী ও সংখ্যালঘুদের নাগরিক অধিকার মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। বিপরীতে তাদের সমর্থকদের দাবি, প্রচলিত দলগুলো নাগরিকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও জাতীয় পরিচয় রক্ষায় ব্যর্থ হওয়ায় তারা কার্যকর বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডির জয় কেবল জার্মানির একটি রাজ্যের বিষয় নয়; বরং তা সামগ্রিক ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের সুস্পষ্ট পূর্বাভাস বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা।
kalprakash.com/IM