মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ২৩ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ২৫ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ | দুপুর ১২:৪৮:৪০
শিরোনাম
ভেনিসে অভিনেত্রী বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় ছাত্রদল সভাপতির নিন্দা অবৈধ ইসরায়েলি বসতির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সীমিত করছে যুক্তরাজ্য মানবিক ও পরিবেশবান্ধব নগরব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য: মাহ্দী আমিন মানবতাবিরোধী অপরাধ: আবুল কালাম আযাদের আপিল শুনানি চার সপ্তাহ মুলতবি ভ্রাতৃত্বের মেলবন্ধন ধ্বংসের অপচেষ্টা চালাচ্ছে চক্রান্তকারীরা: রুহুল কবির রিজভী নারীকর্মীদের সরিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে ধর্মঘট, বন্ধ ঘোষণা করা হলো আইফেল টাওয়ার চ্যাম্পিয়নস লিগের শুরুতেই রিয়াল মাদ্রিদ ও ইন্টার মিলানের মহারণ সংসদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটির সভাপতি হলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ইতালিতে বাঁধনকে হেনস্তার ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়লেন পরীমণি সাতরাস্তা-বেগুনবাড়িতে সড়কজুড়ে অবৈধ ট্রাক পার্কিং, যানজটে অতিষ্ঠ নগরবাসী ভেনিসে অভিনেত্রী বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় ছাত্রদল সভাপতির নিন্দা অবৈধ ইসরায়েলি বসতির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সীমিত করছে যুক্তরাজ্য মানবিক ও পরিবেশবান্ধব নগরব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য: মাহ্দী আমিন মানবতাবিরোধী অপরাধ: আবুল কালাম আযাদের আপিল শুনানি চার সপ্তাহ মুলতবি ভ্রাতৃত্বের মেলবন্ধন ধ্বংসের অপচেষ্টা চালাচ্ছে চক্রান্তকারীরা: রুহুল কবির রিজভী নারীকর্মীদের সরিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে ধর্মঘট, বন্ধ ঘোষণা করা হলো আইফেল টাওয়ার চ্যাম্পিয়নস লিগের শুরুতেই রিয়াল মাদ্রিদ ও ইন্টার মিলানের মহারণ সংসদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটির সভাপতি হলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ইতালিতে বাঁধনকে হেনস্তার ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়লেন পরীমণি সাতরাস্তা-বেগুনবাড়িতে সড়কজুড়ে অবৈধ ট্রাক পার্কিং, যানজটে অতিষ্ঠ নগরবাসী

মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ: যোগ দেওয়ার আগে যেসব ভূরাজনৈতিক হিসাব জরুরি

ফয়সাল আহমেদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৪১
শেয়ার: mail
মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ: যোগ দেওয়ার আগে যেসব ভূরাজনৈতিক হিসাব জরুরি

কাল প্রকাশ। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে সম্প্রতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সমন্বয়ে গঠিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া কতটা যৌক্তিক? বিষয়টি কেবল একটি বহুপাক্ষিক সামরিক চুক্তিতে অংশগ্রহণের সাধারণ সিদ্ধান্ত নয়; বরং এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের সার্বিক নিরাপত্তা, জাতীয় অর্থনীতি, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সমীকরণ, মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূরাজনীতি, জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রবাসী শ্রমিকদের স্বার্থ এবং সর্বোপরি দেশের কৌশলগত স্বাধীনতা বা ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’।

মক্কা চুক্তিকে কেবল ‘মুসলিম বিশ্বের সংহতি ও ঐক্য’ হিসেবে সরলীকরণ করা যেমন ঠিক হবে না, তেমনি এটিকে সরাসরি বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবে চিত্রিত করাও অতিরঞ্জিত। বরং বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই মুহূর্তে এমন একটি স্থায়ী সামরিক কাঠামোর অংশ হওয়া কি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে?

বাস্তবতার নিরিখে বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হয়, বাংলাদেশের এখনই তাড়াহুড়ো করে এই সামরিক জোটে যুক্ত হওয়া সমীচীন হবে না। এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা বা নিরাপত্তা সহযোগিতা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করবে; বরং চুক্তিটির অন্তর্নিহিত রূপরেখা, সম্ভাব্য দায়বদ্ধতা এবং সুদূরপ্রসারী ভূরাজনৈতিক অভিঘাত স্পষ্টভাবে মূল্যায়ন না করে কোনো স্থায়ী সামরিক অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।

মক্কা চুক্তির দৃশ্যমান সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো প্রতিরক্ষা সহযোগিতার হাতছানি। যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিনিময় এবং নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ বাংলাদেশ পেতেই পারে। তা ছাড়া সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান—তিনটি দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান।

তবে এখানে মৌলিক একটি প্রশ্ন রয়েছে—এসব প্রতিরক্ষা সুবিধা অর্জনের জন্য কি বাংলাদেশকে কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে জড়াতেই হবে? সম্ভবত তার কোনো প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ তার প্রতিষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা কূটনীতি, যৌথ মহড়া, পেশাগত প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তি বিনিময়ের মাধ্যমেই এসব সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে। সুতরাং যে চুক্তির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও সামরিক বাধ্যবাধকতা এখনো সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়, সেখানে এখনই যুক্ত হওয়ার যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ।

বাংলাদেশ যদি দ্রুত এই চুক্তিতে যোগ দেয়, তবে ভবিষ্যতে অন্তত পাঁচটি বড় ধরনের কৌশলগত ঝুঁকির মুখোমুখি হতে পারে:

প্রথমত, অন্যদের তুলনায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাস্তবতার ভিন্নতা: পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা নীতি মূলত ভারতকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। সৌদি আরবের নিরাপত্তার হিসাব-নিকাশ মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সংঘাত ও ইরানকে ঘিরে। অন্যদিকে তুরস্কের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারিত হয় সিরিয়া, ইরাক, ককেশাস ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে। বিপরীতে বাংলাদেশের নিরাপত্তার অগ্রাধিকার সম্পূর্ণ আলাদা—সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সমুদ্রসীমার সুরক্ষা, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। তাই অন্য তিন দেশের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থকে একই সামরিক সুতোয় বাঁধার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

দ্বিতীয়ত, ভারতকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য নিরাপত্তা-উদ্বেগ: বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় প্রতিবেশী ভারত। ভারত ও পাকিস্তানের বৈরী সম্পর্ক ও ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব সর্বজনবিদিত। ভবিষ্যতে এই দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা বা সংঘাত তৈরি হলে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে? বাংলাদেশ কি তখন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারবে, নাকি চুক্তির কোনো অলিখিত ধারা তাকে পাকিস্তানের পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট নিরাপত্তা সহযোগিতায় বাধ্য করবে? এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না থাকা পর্যন্ত কোনো সামরিক জোটে পা বাড়ানো কূটনৈতিক দূরদর্শিতা হতে পারে না। বাংলাদেশের কূটনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো একই সঙ্গে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, সৌদি আরব ও ইরানসহ সব পরাশক্তির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখার সক্ষমতা। কোনো একক সামরিক বলয়ে প্রবেশ করলে এই কৌশলগত ভারসাম্য ক্ষুণ্ণ হতে পারে।

তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি: উপসাগরীয় দেশগুলোতে লাখ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত, যাদের প্রেরিত রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকেই আমদানি করে। মক্কা চুক্তি ভবিষ্যতে যদি ওই অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বা কোনো নির্দিষ্ট অক্ষের প্রতিনিধিত্ব করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতায় বাংলাদেশের অর্থনীতি ও প্রবাসী শ্রমবাজার মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

চতুর্থত, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘সিকিউরিটি ডিলেমা’ বা নিরাপত্তা-দ্বিধা: আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রচলিত ‘সিকিউরিটি ডিলেমা’ তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি রাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তা বাড়াতে কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হলে প্রতিপক্ষ বা প্রতিবেশী রাষ্ট্র সেটিকে নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে এবং পাল্টা পদক্ষেপ নেয়। এর ফলে শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষের নিরাপত্তাহীনতাই বাড়ে। বাংলাদেশ যদি নতুন কোনো যৌথ সামরিক কাঠামোর অংশ হয়, তবে আঞ্চলিক শক্তিগুলো সেটিকে কীভাবে নেবে তা এখনো অনিশ্চিত। নিরাপত্তা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে গৃহীত পদক্ষেপই যদি নতুন কৌশলগত অবিশ্বাস ও অস্ত্র প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়, তবে তা ইতিবাচক ফল আনবে না।

পঞ্চমত, ভবিষ্যৎ সার্বভৌম সিদ্ধান্তের সীমাবদ্ধতা: পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত কেবল বর্তমান দিয়ে বিবেচনা করা যায় না। আজ সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলেও আগামী এক দশকে বৈশ্বিক রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বদলে যেতে পারে। সরকার ও নেতৃত্বের পরিবর্তন হতে পারে, এমনকি মিত্র দেশগুলোর নিজেদের সম্পর্কের রসায়নেও পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু একবার কোনো আন্তর্জাতিক সামরিক অঙ্গীকারে যুক্ত হলে সেখান থেকে বের হয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন। তাই প্রশ্ন শুধু তাৎক্ষণিক সুবিধার নয়, বরং এই চুক্তি আগামী ১০ থেকে ২০ বছর পর দেশকে কোন দিকে চালিত করবে—তা বিবেচনা করা জরুরি।

তাহলে কি বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন ও নিরাপত্তা সহযোগিতা থেকে পিছিয়ে থাকবে? কখনোই নয়। সামরিক প্রশিক্ষণ, সমরাস্ত্রের আধুনিকায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, সাইবার ও সমুদ্র নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। তবে এর জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ সামরিক ব্লকের অংশ হওয়াই একমাত্র সমাধান নয়।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবমুখী কৌশল হতে পারে শর্তসাপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পৃক্ততা। চুক্তির সার্বিক রূপরেখা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা, সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরূপণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়া। একই সঙ্গে সংসদ, সামরিক ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞ, জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত মতামতের ভিত্তিতেই যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি কোনো সামরিক বলয়ের দাসত্ব নয়, বরং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা রক্ষা করা। তাই মক্কা চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সর্বোত্তম কৌশল হওয়া উচিত—কূটনৈতিক আলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখা, কিন্তু কোনো তাড়াহুড়ো না করা। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করা সহজ, কিন্তু তার দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক ফাঁদ থেকে মুক্ত হওয়া প্রায় অসম্ভব। শেষ পর্যন্ত আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত—আগামী দিনের অনিশ্চিত ও মেরুকৃত বিশ্বে আমরা কতটা স্বাধীনভাবে নিজেদের জাতীয় স্বার্থে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছি।

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | Globe kalprakash.com

মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ: যোগ দেওয়ার আগে যেসব ভূরাজনৈতিক হিসাব জরুরি

বিস্তারিত কমেন্টে