মহাকাশের গভীরে দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের চোখে ধরা পড়ছিল রহস্যময় কিছু লালচে আলোর বিন্দু। দেখতে নক্ষত্রের মতো হলেও এদের অস্বাভাবিক উজ্জ্বলতা ও আলোর বৈশিষ্ট্য প্রচলিত কোনো মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে পুরোপুরি মিলছিল না। এবার সেই রহস্যের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা সামনে এনেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত জ্যোতির্বিজ্ঞানী রোহন নাইডু ও তাঁর সহকর্মীরা। তাঁদের গবেষণায় উঠে এসেছে নতুন ধরনের এক মহাজাগতিক বস্তু—‘ব্ল্যাক হোল স্টার’ বা কৃষ্ণগহ্বর নক্ষত্র। গবেষণাটি ১২ আগস্ট আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণার কেন্দ্রীয় বস্তুটির নাম MoM-BH*-1। নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের তথ্য বিশ্লেষণ করে এর সন্ধান পাওয়া যায়। বস্তুটি এমন এক সময়ের মহাবিশ্বকে প্রতিনিধিত্ব করছে, যখন বিগ ব্যাংয়ের মাত্র প্রায় ৬৬ কোটি বছর পেরিয়েছে। অর্থাৎ, আমরা এর যে আলো এখন দেখতে পাচ্ছি, তা মহাবিশ্বের একেবারে শৈশবের।
হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোনমির সহকারী অধ্যাপক রোহন নাইডুর নেতৃত্বে গবেষকরা দেখেছেন, MoM-BH*-1 দেখতে একটি বিশাল লাল নক্ষত্রের মতো হলেও এর শক্তি উৎপাদন সাধারণ নক্ষত্রের নিয়মে ফেলা যায় না। গবেষকদের মডেল অনুযায়ী, এর কেন্দ্রে রয়েছে একটি সক্রিয় কৃষ্ণগহ্বর, যার চারপাশে সৌরজগতের প্রায় সমান আকারের অত্যন্ত ঘন হাইড্রোজেন গ্যাসের আবরণ রয়েছে।
বিষয়টির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এর বিপুল উজ্জ্বলতা। গবেষকদের হিসাবে, বস্তুটি সাধারণ নক্ষত্রের পারমাণবিক ফিউশন থেকে উৎপন্ন হতে পারা শক্তির তুলনায় প্রায় ১০০ বিলিয়ন গুণ বেশি উজ্জ্বল। ফলে কেবল একটি সাধারণ নক্ষত্র দিয়ে এর বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, কেন্দ্রে থাকা কৃষ্ণগহ্বর আশপাশের পদার্থ গ্রাস করার সময় বিপুল শক্তি নির্গত করছে। সেই শক্তি ঘন গ্যাসের আবরণের মধ্য দিয়ে বাইরে আসার সময় এমন বৈশিষ্ট্য অর্জন করে, যার কারণে পুরো বস্তুটিকে দূর থেকে একটি নক্ষত্রের মতো দেখায়। এ কারণেই গবেষকেরা এর নাম দিয়েছেন ব্ল্যাক হোল স্টার।
MoM-BH*-1-এর আরেকটি বিশেষত্ব হলো, এটি এতটাই উজ্জ্বল যে এর আশ্রয়দাতা ছায়াপথের আলোকেও প্রায় পুরোপুরি ছাপিয়ে গেছে। ফলে বিজ্ঞানীরা এর আলো তুলনামূলকভাবে পরিষ্কারভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছেন। গবেষকদের ধারণা, জেমস ওয়েব টেলিস্কোপে দেখা অসংখ্য রহস্যময় লিটল রেড ডটের পেছনেও এ ধরনের কৃষ্ণগহ্বর নক্ষত্র থাকতে পারে।
গবেষণাটি মহাবিশ্বের শুরুর দিককার কৃষ্ণগহ্বর কীভাবে দ্রুত বড় হয়ে পরবর্তীতে দানবীয় কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয়েছিল, সেই রহস্য উন্মোচনেও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে। তবে গবেষকেরা এটিকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে নয়, বরং পর্যবেক্ষণ ও মডেলের সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এ ধরনের আরও বস্তু শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হলে ব্ল্যাক হোল স্টারের প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
kalprakash.com/IM