সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ৫ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ৮ রবিউস সানী, ১৪৪৮ | রাত ১১:২৬:৫২
শিরোনাম
কয়েকদিন টানা বৃষ্টির পূর্বাভাস, কমতে পারে তাপপ্রবাহ মঙ্গলবার রাজধানীর কয়েক এলাকায় ৫ ঘণ্টা গ্যাস বন্ধ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাসভাড়া ২০ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব হোটেলে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ওঠেন, সকালে মিলল যুবকের মরদেহ রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে গাজী নজরুলের রিমান্ড হাদি হত্যা মামলার মূল অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদের বিরুদ্ধে দুদকের দুই মামলা শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসায় বড় অঙ্কের অর্থ দিলেন মেসি অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে শুরুতে ফাহাদকে সন্দেহ করেনি পরিবার হজের টাকা জমা দিতে শুক্র-শনিবার ব্যাংক খোলা কয়েকদিন টানা বৃষ্টির পূর্বাভাস, কমতে পারে তাপপ্রবাহ মঙ্গলবার রাজধানীর কয়েক এলাকায় ৫ ঘণ্টা গ্যাস বন্ধ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাসভাড়া ২০ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব হোটেলে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ওঠেন, সকালে মিলল যুবকের মরদেহ রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে গাজী নজরুলের রিমান্ড হাদি হত্যা মামলার মূল অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদের বিরুদ্ধে দুদকের দুই মামলা শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসায় বড় অঙ্কের অর্থ দিলেন মেসি অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে শুরুতে ফাহাদকে সন্দেহ করেনি পরিবার হজের টাকা জমা দিতে শুক্র-শনিবার ব্যাংক খোলা

একজন সাঈদুর রহমান রিমনের বিদায়, এক যুগের অবসান

কাল প্রকাশ
কাল প্রকাশ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬, ৯:৪১
শেয়ার: mail
একজন সাঈদুর রহমান রিমনের বিদায়, এক যুগের অবসান

একজন সাঈদুর রহমান রিমনের বিদায়, এক যুগের অবসান (বিনম্র শ্রদ্ধা)

বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এমন কিছু মানুষের নাম লেখা আছে, যাদের অবদানকে কেবল পদ-পদবি, পুরস্কার কিংবা কর্মস্থলের তালিকা দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। তারা একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী নন; তারা নিজেরাই একটি প্রতিষ্ঠান। তারা কেবল সংবাদ পরিবেশন করেন না; তারা সময়কে লিপিবদ্ধ করেন, সমাজকে প্রশ্ন করেন, রাষ্ট্রকে জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করান এবং মানুষের নীরব কান্নাকে জাতীয় আলোচনায় পরিণত করেন।

দেশবরেণ্য অনুসন্ধানী সাংবাদিক সাঈদুর রহমান রিমন ছিলেন তেমনই একজন।

তার নাম উচ্চারণ করলে শুধু একজন প্রতিবেদকের মুখ নয়, চোখের সামনে ভেসে ওঠে একজন নিরলস সংবাদযোদ্ধার প্রতিচ্ছবি—যিনি জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো কাটিয়েছেন মানুষের গল্প খুঁজে বেড়াতে, সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে এবং অন্ধকারের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতাকে আলোর সামনে নিয়ে আসতে।

সাংবাদিকতা তার কাছে কখনো চাকরি ছিল না। ছিল না খ্যাতি অর্জনের সিঁড়ি কিংবা পদ-পদবির প্রতিযোগিতা। সাংবাদিকতা ছিল তার বিশ্বাস, তার দায়বদ্ধতা, তার নৈতিক অবস্থান এবং সর্বোপরি মানুষের প্রতি এক গভীর অঙ্গীকার।

আজকের সময়ে সংবাদ অনেক দ্রুত আসে, দ্রুতই হারিয়েও যায়। কিন্তু কিছু সংবাদ সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকে। কারণ সেই সংবাদে থাকে মানুষের জীবন, সমাজের বাস্তবতা এবং একজন সাংবাদিকের নির্ভীক বিবেক। সাঈদুর রহমান রিমনের লেখা বহু প্রতিবেদন সেই বিরল মর্যাদা অর্জন করেছে।

তিনি এমন এক প্রজন্মের সাংবাদিক, যারা সংবাদ সংগ্রহের জন্য শুধু কলম কিংবা ক্যামেরা নয়, নিজের জীবনকেও ঝুঁকির মুখে রাখতে দ্বিধা করতেন না। সীমান্ত, পাহাড়, অরণ্য, প্রত্যন্ত গ্রাম, আদালত, হাসপাতাল, সংসদ কিংবা অপরাধচক্রের আস্তানা—যেখানে সত্য লুকিয়ে ছিল, সেখানেই পৌঁছে গেছেন তিনি। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন সাংবাদিকের আসল পরিচয় ডেস্কে নয়, মাঠে।

১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার জাবরা পীরবাড়িতে জন্ম নেওয়া সাঈদুর রহমান রিমনের শৈশব কেটেছে সাহিত্য ও মননের আবহে। তার বাবা ইউনুস উদ্দিন আহমেদ ছিলেন সাহিত্যিক এবং সাংবাদিক। ফলে শব্দ, সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার বীজ রোপিত হয়েছিল পরিবার থেকেই। মা সাহারা আহমেদের স্নেহ, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশ তার ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ছাত্রজীবনেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন—তার পথ অন্যরকম। ১৯৮৫ সালে সাপ্তাহিক মুক্তিবাণী পত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে শুরু হয় তার সাংবাদিকতা। তখন হয়তো তিনি নিজেও জানতেন না, এই ছোট্ট শুরু একদিন বাংলাদেশের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হবে।

এরপর দীর্ঘ পথচলা। দৈনিক ইত্তেফাক-এর সাভার সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন সাধারণ মানুষের জীবন, অন্যায়, বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। সেখানেই গড়ে ওঠে তার অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি। সংবাদ তার কাছে কেবল তথ্য নয়; বরং মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি।

পরবর্তী সময়ে তিনি একে একে দায়িত্ব পালন করেন দৈনিক আল-আমীন, বাংলাবাজার, মুক্তকণ্ঠ, মানবজমিন, সংবাদ, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, শেষে বাংলাদেশ প্রতিদিনের ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেলের প্রধানসহ দেশের বিভিন্ন শীর্ষ গণমাধ্যমে। কর্মজীবনের শেষ পর্বে দৈনিক দেশবাংলা-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক ঢাকা প্রতিদিন-এর উপদেষ্টা সম্পাদক এবং দৈনিক বাংলাভূমি-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তবে পদ যত বড় হয়েছে, মানুষটি ততটাই বিনয়ী থেকেছেন। এটাই ছিল সাঈদুর রহমান রিমনের সবচেয়ে বড় শক্তি।

তার সহকর্মীরা বলেন, তিনি সম্পাদক হওয়ার পরও নিজেকে রিপোর্টার বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। কারণ তার বিশ্বাস ছিল—সংবাদপত্রের প্রাণ ডেস্কে নয়, মাঠে; মানুষের ভিড়ে, জনপদের ধুলোয়, সীমান্তের অনিশ্চয়তায়, সেই সব অচেনা মুখের কাছে, যাদের কথা কেউ শোনে না।

সম্ভবত এই কারণেই তিনি ছিলেন আলাদা।

আজ যখন অধিকাংশ সাংবাদিক নির্দিষ্ট একটি বিটে কাজ করেন, তখন রিমন ছিলেন বহুমাত্রিক। রাজনীতি, অর্থনীতি, অপরাধ, বিচার, সংসদ, কূটনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, পরিবেশ, শেয়ারবাজার, নির্বাচন—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি কাজ করেছেন। এই বহুমাত্রিকতা তাকে শুধু একজন দক্ষ রিপোর্টার নয়, একজন পূর্ণাঙ্গ সংবাদকর্মীতে পরিণত করেছে।

কিন্তু তার আসল পরিচয় এখনো বলা হয়নি। তার সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি সত্যের কাছে কখনো আপস করেননি। ক্ষমতার কাছে নতি স্বীকার করেননি। ভয়কে কখনো পেশার অংশ বানাননি। সত্যের জন্য প্রয়োজন হলে তিনি পথ বদলেছেন, কর্মস্থল বদলেছেন, কিন্তু নীতি বদলাননি।

আর এখানেই সাঈদুর রহমান রিমন অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে ওঠেন। তিনি শুধু সংবাদ লেখেননি। তিনি সাংবাদিকতার বিবেককে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন।

 

মাঠই ছিল যার বিশ্ববিদ্যালয়

একজন সাংবাদিককে চেনার সবচেয়ে বড় উপায় তার কর্মস্থল নয়, তার কর্মক্ষেত্র। কেউ নিউজরুমে বড় হন, কেউ স্টুডিওতে। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাদের প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠে মাঠ—মানুষের জীবন, কষ্ট, সংগ্রাম এবং বাস্তবতার অজস্র অনুচ্চারিত গল্প। সাঈদুর রহমান রিমনের সাংবাদিকতা ছিল সেই ধারার।

সত্যের সন্ধানে তিনি শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক সাংবাদিকতায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে গেছেন তিনি। পাহাড়, সীমান্ত, চর, হাওর, সুন্দরবন, আদিবাসী অধ্যুষিত জনপদ, দুর্গম বনাঞ্চল কিংবা সংঘাতপ্রবণ এলাকা—যেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ গল্প লুকিয়ে আছে বলে বিশ্বাস করেছেন, সেখানেই পৌঁছে গেছেন নিজের ঝুঁকি নিয়ে।

এ কারণেই তার সাংবাদিকতা ছিল কাগজে-কলমে নয়; ছিল মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ।

দৈনিক ইত্তেফাক-এ কর্মরত অবস্থায় ধামরাই অঞ্চলের অপহরণ চক্র, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচারের অভিযোগ এবং শিশু খাদ্যে তেজস্ক্রিয়তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে তার প্রতিবেদন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এরপর কর্মজীবনের প্রতিটি ধাপে তার অনুসন্ধান আরও পরিণত, আরও গভীর এবং আরও সাহসী হয়ে ওঠে।

দৈনিক বাংলাবাজার-এ দায়িত্ব পালন ছিল তার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সুন্দরবন নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন, সীমান্ত পরিস্থিতি, জাসদ নেতা কাজী আরেফ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের অনুসন্ধান এবং নরসিংদীতে বিষাক্ত মদপানে বহু মানুষের মৃত্যুর ঘটনার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তখন পাঠকমহলে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। এসব প্রতিবেদনের কারণে তিনি শুধু প্রশংসাই পাননি; মামলা, হুমকি এবং প্রতিশোধের মুখোমুখিও হয়েছেন।

একটি সংবাদ কখনো কখনো কতটা শক্তিশালী হতে পারে, তা তিনি নিজের জীবন দিয়েই উপলব্ধি করেছিলেন।

তবে ভয় তাকে থামাতে পারেনি। বরং প্রতিটি বাধা যেন তাকে আরও দৃঢ় করেছে।

পরবর্তীতে দৈনিক সংবাদ-এ যোগ দেওয়ার পর তার সাংবাদিকতায় যেন নতুন এক দিগন্ত উন্মোচিত হয়। নিজেই একাধিকবার বলেছেন, সাংবাদিকতার সবচেয়ে পরিপূর্ণ সময় তিনি এই প্রতিষ্ঠানেই কাটিয়েছেন। এখানে তিনি শুধু সংবাদ লেখেননি; নিজেকে নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন।

গারো পাহাড়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, খাসিয়া সম্প্রদায়ের জীবনসংগ্রাম, সীমান্ত এলাকায় বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা, হালুয়াঘাট সীমান্তের নিরাপত্তা বাস্তবতা, দুর্গম অঞ্চলের মানুষের বঞ্চনা—এমন বহু বিষয় তিনি ধারাবাহিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে জাতীয় পরিসরে তুলে আনেন।

এগুলো ছিল কেবল প্রতিবেদন নয়; রাষ্ট্রের প্রান্তিক মানুষদের কণ্ঠস্বর।

সাংবাদিকতার প্রয়োজনে তিনি দেশের ৬০টিরও বেশি জেলা এবং শত শত উপজেলা সফর করেছেন। দুর্গম এলাকায় দিনের পর দিন অবস্থান করেছেন। কখনো পাহাড়ি পথে হেঁটেছেন, কখনো সীমান্তবর্তী অজানা জনপদে থেকেছেন, কখনো বনাঞ্চলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছেন।

আজকের দিনে ডিজিটাল প্রযুক্তি অনেক কাজ সহজ করে দিয়েছে। কিন্তু রিমনের সাংবাদিকতা গড়ে উঠেছিল এমন এক সময়ে, যখন একটি তথ্য যাচাই করতে দিনের পর দিন মাঠে থাকতে হতো। একটি ছবি তুলতে কিংবা একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য সংগ্রহ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো।

সেই শ্রমসাধ্য সাংবাদিকতাই তাকে আলাদা করেছে।

তার লেখা বহু প্রতিবেদন প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কোথাও তদন্ত শুরু হয়েছে, কোথাও নীতিগত আলোচনা হয়েছে, কোথাও ভুক্তভোগী মানুষ রাষ্ট্রীয় সহায়তা পেয়েছেন। একজন সাংবাদিকের কলম যে সমাজে বাস্তব পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে, তার কর্মজীবন তারই প্রমাণ।

সাংবাদিকতা নিয়ে তার একটি দর্শন ছিল—ঘটনার পেছনের ঘটনা খুঁজে বের করা।

তিনি কখনো কেবল ঘটনাটি লিখে থেমে থাকতেন না। চেষ্টা করতেন কেন ঘটল, কারা দায়ী, এর সামাজিক প্রভাব কী, মানুষের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কতটা—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে। এই কারণেই তার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো সময়ের পরীক্ষায় টিকে আছে।

তিনি কখনো সহজ পথ বেছে নেননি। কারণ তিনি জানতেন, সহজ পথে হয়তো দ্রুত সংবাদ পাওয়া যায়, কিন্তু গভীর সত্য পাওয়া যায় না।

একজন সাংবাদিকের কাছে মাঠ ছিল তার বিশ্ববিদ্যালয়। মানুষ ছিল তার পাঠ্যপুস্তক। আর সত্য ছিল তার একমাত্র শিক্ষক।

সাঈদুর রহমান রিমনের সাংবাদিকতা আমাদের সেই পাঠই আবার মনে করিয়ে দেয়—সংবাদ শুধু তথ্যের সমষ্টি নয়; এটি মানুষের জীবন, রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা এবং সাংবাদিকের বিবেকের সম্মিলিত দলিল।

এই বিবেকই তাকে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল।

 

যে কলম ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিল

সত্য লেখা কখনোই সহজ ছিল না। বিশেষ করে সেই সত্য যদি ক্ষমতার অস্বস্তির কারণ হয়, যদি তা প্রভাবশালী ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা অপরাধচক্রের স্বার্থে আঘাত হানে। তবু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—কিছু সাংবাদিক আছেন, যারা ভয়কে পেশার অংশ হতে দেননি। সাঈদুর রহমান রিমন ছিলেন সেই বিরল ধারার একজন।

তার সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি প্রশ্ন করতে জানতেন। শুধু প্রশ্নই নয়, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার ধৈর্য, দক্ষতা এবং সাহসও ছিল তার।

দৈনিক বাংলাবাজার, মানবজমিন, সংবাদ, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম এবং পরে বাংলাদেশ প্রতিদিন—প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে তিনি এমনসব অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছেন, যা শুধু পাঠকের আগ্রহই তৈরি করেনি; অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসন, নীতিনির্ধারক এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দৃষ্টিও আকর্ষণ করেছে।

তার সাংবাদিকতার বিস্তৃতি ছিল বিস্ময়কর। রাজনীতি, অর্থনীতি, অপরাধ, আদালত, সংসদ, নির্বাচন, কূটনীতি, প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, পরিবেশ, নাগরিক সেবা কিংবা শেয়ারবাজার—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি কাজ করেছেন। আজকের দিনে বিটভিত্তিক সাংবাদিকতা প্রচলিত হলেও, তিনি বিষয়ভিত্তিক সীমারেখা অতিক্রম করে একজন পূর্ণাঙ্গ মাঠের সাংবাদিকের পরিচয় দিয়েছেন।

একজন অনুসন্ধানী প্রতিবেদকের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিশ্বাসযোগ্য সূত্র, ধৈর্য এবং তথ্য যাচাইয়ের ক্ষমতা। সাঈদুর রহমান রিমনের কাজের ভেতরে এই তিনটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

গারো পাহাড়, খাসিয়া পল্লি, সীমান্তবর্তী জনপদ, হালুয়াঘাট, সুন্দরবন কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম তিনি যেভাবে জাতীয় সংবাদপত্রের পাতায় তুলে এনেছেন, তা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সামাজিক দায়বদ্ধতার এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

তার কিছু প্রতিবেদন ছিল সাহসিকতারও অনন্য দৃষ্টান্ত। সীমান্ত এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ, দুর্গম এলাকায় প্রবেশ, প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ—এসব কাজের কারণে তাকে বারবার হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। কোথাও আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে, কোথাও মানহানির মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে।

কিন্তু তিনি থামেননি। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন—সাংবাদিক যদি ভয়কে মেনে নেয়, তাহলে সত্যের পথ আরও সংকুচিত হয়ে যায়।

তার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের স্বীকৃতিও এসেছে বিভিন্ন সময়ে। ইয়াসমীন স্মৃতি পুরস্কার, চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন স্মৃতি পুরস্কার, ইউএনডিপি সেমপ-বেলা পুরস্কার, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সম্মাননাসহ বিভিন্ন পুরস্কার তার কর্মজীবনকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু যারা তাকে কাছ থেকে দেখেছেন, তারা জানেন—পুরস্কারের চেয়ে একটি ভালো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তাকে অনেক বেশি আনন্দ দিত।

তার কাছে সাংবাদিকতা ছিল না ব্যক্তিগত খ্যাতি অর্জনের মাধ্যম; ছিল মানুষের আস্থা অর্জনের পথ।

এই কারণেই তিনি অসংখ্য তরুণ সাংবাদিককে একটি কথা বারবার বলতেন— তথ্য যাচাই ছাড়া সংবাদ নয়। এই দর্শনই তাকে আলাদা করেছে।

একটি ভালো সংবাদ শুধু দ্রুত প্রকাশ করলেই হয় না; সেটি নির্ভুল, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দায়িত্বশীলও হতে হয়। আজ যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে যাচাইবিহীন তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তখন সাঈদুর রহমান রিমনের সাংবাদিকতা নতুন করে আমাদের শেখায়— বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে গেলে সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তিটাই হারিয়ে যায়।

সত্যের প্রতি এই দায়বদ্ধতা তাকে শুধু একজন দক্ষ প্রতিবেদক নয়, একজন নৈতিক সাংবাদিকে পরিণত করেছিল।

আজকের প্রজন্মের অনেক সাংবাদিক হয়তো তার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাননি। কিন্তু তার প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, তার কর্মপদ্ধতি এবং তার পেশাগত অবস্থান এখনো শেখার বিষয়।

একজন সাংবাদিকের জীবন কতটা কষ্ট, ত্যাগ, ঝুঁকি এবং দায়িত্বে ভরা হতে পারে—সাঈদুর রহমান রিমনের কর্মজীবন তার জীবন্ত প্রমাণ।

তার কলম কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ছিল না। তার কলম ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

তার প্রতিবেদন কোনো প্রতিহিংসার ভাষা ছিল না। সেটি ছিল সত্য উদ্ঘাটনের ভাষা।

আর সেই কারণেই সময়ের ব্যবধানে অনেক সংবাদ পুরোনো হয়ে গেলেও, একজন সাঈদুর রহমান রিমনের সাংবাদিকতা আজও প্রাসঙ্গিক।

কারণ সত্যের কোনো মেয়াদ থাকে না।

 

সম্পাদক নয়, তিনি ছিলেন একজন নির্মাতা

একজন সংবাদকর্মীর সবচেয়ে বড় সাফল্য কী? অসংখ্য আলোচিত প্রতিবেদন? রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি? নাকি বড় কোনো সংবাদপত্রের সম্পাদক হওয়া?

সাঈদুর রহমান রিমনের জীবন যেন এই প্রশ্নের এক ভিন্ন উত্তর।

তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন সাংবাদিকের প্রকৃত সাফল্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তিনি নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে পারেন। একজন সম্পাদক তখনই সফল হন, যখন তার নেতৃত্বে একটি সংবাদকক্ষ শুধু সংবাদ প্রকাশ করে না। বরং সত্য, দায়িত্ববোধ এবং পেশাগত সততার একটি সংস্কৃতি নির্মাণ করে।

দীর্ঘ মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি যখন সম্পাদকীয় দায়িত্বে আসেন, তখনও তার ভেতরের রিপোর্টারটি হারিয়ে যায়নি। বরং সেই রিপোর্টারের অভিজ্ঞতাই তাকে একজন ব্যতিক্রমী সম্পাদক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

দৈনিক দেশবাংলা-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে তিনি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন এবং তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশে বিশেষ গুরুত্ব দেন। পরবর্তীতে দৈনিক ঢাকা প্রতিদিন-এর উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি তরুণ সাংবাদিকদের নিয়ে একটি কর্মচঞ্চল সংবাদকক্ষ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। জীবনের শেষ অধ্যায়ে দৈনিক বাংলাভূমি-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবেও একই আদর্শ ধরে রাখেন— সংবাদ হবে নির্ভুল, দায়িত্বশীল এবং মানুষের পক্ষে।

তার কাছে সম্পাদকীয় চেয়ার ক্ষমতার আসন ছিল না; ছিল দায়িত্বের আসন।

তিনি প্রায়ই বলতেন, সম্পাদক যদি সংবাদকক্ষের দরজা বন্ধ করে ফেলেন, তাহলে তিনি পাঠকের কাছ থেকেও দূরে সরে যান। তাই তিনি ডেস্কে বসে শুধু নির্দেশ দিতেন না; প্রয়োজনে নিজেই মাঠে নেমে তথ্য যাচাই করতেন, প্রতিবেদকের সঙ্গে ঘটনাস্থলে যেতেন, খসড়া রিপোর্ট হাতে নিয়ে লাইন ধরে সম্পাদনা করতেন। তার কাছে সংবাদ সম্পাদনা ছিল কেবল ভাষা সংশোধন নয়; ছিল সত্যকে আরও নির্ভুলভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব।

অনেক তরুণ সাংবাদিক আজও স্মরণ করেন— একটি রিপোর্টে ভুল তথ্য থাকলে তিনি কঠোর হতেন, কিন্তু একজন প্রতিবেদকের মনোবল ভেঙে দিতেন না। ভুল শুধরে দিতেন, যুক্তি ব্যাখ্যা করতেন, আবার পরের দিন নতুন দায়িত্বও দিতেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, ভাল সাংবাদিক তৈরি হয় শিক্ষা, অনুশীলন ও সততার সমন্বয়ে।

এই কারণেই তার হাতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য তরুণ সাংবাদিক। আজ দেশের বিভিন্ন জাতীয়, আঞ্চলিক ও অনলাইন গণমাধ্যমে দায়িত্ব পালন করছেন এমন অনেক সংবাদকর্মী নিজেদের পথচলার শুরুতে সাঈদুর রহমান রিমনের সান্নিধ্য পেয়েছেন। তাদের কাছে তিনি শুধু সম্পাদক ছিলেন না; ছিলেন শিক্ষক, পরামর্শদাতা এবং প্রয়োজনে অভিভাবক।

 

মানুষ রিমন— শিক্ষাগুরু, সাংবাদিক নেতা ও নির্যাতিত সাংবাদিকদের কণ্ঠস্বর

একজন সাংবাদিকের পরিচয় শুধু তার লেখা নয়, তার গড়ে তোলা মানুষগুলোর মধ্যেও বেঁচে থাকে। সেই অর্থে সাঈদুর রহমান রিমন কেবল একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি প্রজন্মের নির্মাতা।

দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি অসংখ্য তরুণকে হাতে-কলমে সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির কৌশল এবং সাংবাদিকতার নৈতিকতা শিখিয়েছেন। আজ দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, অনলাইন গণমাধ্যম, টেলিভিশন এবং আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমে কর্মরত বহু সাংবাদিকের পথচলার শুরুতে রয়েছে তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অবদান।

তিনি বিশ্বাস করতেন— একজন ভালো সাংবাদিক শুধু ক্লাসরুমে তৈরি হয় না; তৈরি হয় মাঠে, মানুষের মাঝে, বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। তাই নতুনদের তিনি শুধু দায়িত্ব দিতেন না, দায়িত্ব পালনের সাহসও দিতেন।

সাঈদুর রহমান রিমনের আরেকটি বড় পরিচয় ছিল— তিনি ছিলেন সাংবাদিকদের আস্থার ঠিকানা।

তিনি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)-এর স্থায়ী সদস্য ছিলেন। একই সঙ্গে ছিলেন ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ক্র্যাব)-এরও স্থায়ী সদস্য। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ)-এর সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তবে বিস্ময়ের বিষয় হলো, তিনি কখনো এসব পরিচয়কে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম বানাননি। নিজের নামের আগে বা পরে সংগঠনের পদ-পদবি যুক্ত করে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা তার মধ্যে ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন— একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার সততা, তার সংবাদ এবং তার কর্ম। এই বিনয়ই তাকে আরও বড় করে তুলেছিল।

সাংবাদিকদের অধিকার, নিরাপত্তা এবং পেশাগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন। সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেই তিনি সরব হতেন। কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, হামলা কিংবা হয়রানির খবর পেলেই নীরবে পাশে দাঁড়াতেন। প্রচারের জন্য নয়, দায়িত্ববোধ থেকেই।

এই বিশ্বাস থেকেই ২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ সাংবাদিক কমিউনিটি (বিএসসি)। সংগঠনটির মূল দর্শন ছিল— দেশের সব সাংবাদিকের মধ্যে ঐক্য, পেশাগত মর্যাদা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা।

এর আগেই জুলাইয়ের সহিংসতায় পুলিশের গুলিতে নিহত সাংবাদিকদের স্মরণে এবং বিচার দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে তার উদ্যোগে আয়োজিত বিশাল মানববন্ধন সাংবাদিক সমাজে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সেটি ছিল শুধু একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি নয়; ছিল সাংবাদিক সমাজের বিবেকের প্রকাশ।

তিনি ছিলেন নির্যাতিত-নিপীড়িত সাংবাদিকদের কণ্ঠস্বর। তার কাছে সাংবাদিক মানে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; সহযোদ্ধা।

ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অবিশ্বাস্য রকমের বিনয়ী। এত অর্জন, এত অভিজ্ঞতা, এত সম্মান— কিছুই তাকে অহংকারী করতে পারেনি। বরং তিনি প্রায়ই বলতেন, “আমি এখনও ভালো রিপোর্টার হতে পারিনি।”

এই আত্মসমালোচনার শক্তিই তাকে আজীবন শিখিয়েছে এবং শিখিয়েছে অন্যদেরও।

আমার ব্যক্তিগত জীবনেও তার ঋণ চিরস্মরণীয়।

আমি, আজিজুল ইসলাম যুবরাজ, গর্বের সঙ্গে বলি— আমি রিমন সৈনিক। আমি তাকে আমার শিক্ষাগুরু বলেই পরিচয় দিই। তিনি আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো আদর-স্নেহ করতেন। সাংবাদিকতার পথে আমার যতটুকু অর্জন, তার পেছনে রিমন ভাইয়ের শিক্ষা, দিকনির্দেশনা এবং অনুপ্রেরণার অবদান আমি কখনো অস্বীকার করতে পারব না।

শিক্ষাগুরুরা কখনো মৃত্যুবরণ করেন না। তারা বেঁচে থাকেন তাদের শিষ্যদের কর্মে।

আর সাঈদুর রহমান রিমনও ঠিক তেমনই একজন শিক্ষাগুরু, যিনি তার হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য সাংবাদিকের মধ্য দিয়ে আজও বেঁচে আছেন।

আর সেই কারণেই আজও মনে হয়— সাঈদুর রহমান রিমনকে নিয়ে লেখা শেষ করা যায় না। তাকে নিয়ে আরও লেখা যায়, আরও বলা যায়, আরও গবেষণা করা যায়। কারণ তিনি শুধু একজন মানুষ ছিলেন না; তিনি বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক চলমান অধ্যায়।

 

ইতিহাস যাদের ভুলে না

ইতিহাস কেবল তাদেরই মনে রাখে, যারা নিজেদের জন্য নয়— সময়ের জন্য বাঁচেন। সাঈদুর রহমান রিমন ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।

একটি জীবনে তিনি যা রেখে গেছেন, তা কোনো পদবি দিয়ে মাপা যায় না। তিনি ছিলেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক, সম্পাদক, সংগঠক, সাংবাদিক নেতা, শিক্ষক এবং সর্বোপরি একজন বিবেকবান মানুষ।

তার সাংবাদিকতা আমাদের শিখিয়েছে— সংবাদ মানে শুধু তথ্য নয়; সংবাদ মানে মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি। তার কর্মজীবন আমাদের শিখিয়েছে— একজন প্রতিবেদকের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সাহস। তার ব্যক্তিত্ব আমাদের শিখিয়েছে— যত বড় হও, তত বিনয়ী হও। তার নেতৃত্ব আমাদের শিখিয়েছে— সাংবাদিকদের বিভক্ত নয়, ঐক্যবদ্ধ থাকতে হয়।

আজ যখন আমরা তার জীবনকে ফিরে দেখি, তখন বুঝতে পারি—তিনি কেবল সংবাদ তৈরি করেননি, তিনি সাংবাদিকও তৈরি করেছেন। কেবল পত্রিকা সম্পাদনা করেননি, তিনি সংবাদকক্ষের সংস্কৃতি গড়ে তুলেছেন। কেবল অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখেননি, অন্যায়ের শিকার সাংবাদিকদের জন্যও লড়েছেন।

এ কারণেই তাকে নিয়ে আলোচনা শেষ হওয়ার নয়। তাকে নিয়ে গবেষণা হতে পারে। তাকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ হতে পারে। তাকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হতে পারে। কারণ তার জীবন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন পরিপূর্ণ একজন মানুষ। স্ত্রী চামেলী রহমান ছিলেন তার জীবনের নীরব প্রেরণা। একমাত্র কন্যা সিলভী রহমান উর্মি আজ জার্মানিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন এবং নিজের জীবন গড়ে তুলছেন। পরিবারের প্রতি দায়িত্ব, পেশার প্রতি নিষ্ঠা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা—এই তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল তার জীবন।

অনেকে বলেন, একজন মানুষের মৃত্যু হয় তার শেষ নিঃশ্বাসে। আমি তা বিশ্বাস করি না। আমি বিশ্বাস করি, একজন মানুষের মৃত্যু হয় তখনই, যখন তাকে কেউ আর স্মরণ করে না।

সাঈদুর রহমান রিমনকে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।

যতদিন এই দেশে সত্যের পক্ষে কলম ধরবে কোনো সাংবাদিক… যতদিন কোনো তরুণ সংবাদ সংগ্রহের জন্য কাদা মাড়িয়ে দুর্গম জনপদে যাবে… যতদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনো সম্পাদক আপসহীন অবস্থান নেবেন… যতদিন নির্যাতিত কোনো সাংবাদিক পাশে একজন সহযোদ্ধাকে খুঁজবেন… ততদিন সাঈদুর রহমান রিমন বেঁচে থাকবেন।

তাকে নিয়ে হাজারো প্যাকেজ নির্মাণ করা যাবে। শত শত প্রবন্ধ লেখা যাবে। অসংখ্য স্মৃতিচারণ রচিত হবে। তবুও তাকে সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে না। কারণ তিনি শুধু একজন মানুষ নন, একটি প্রতিষ্ঠান। শুধু একজন সম্পাদক নন, একটি স্কুল। শুধু একজন রিপোর্টার নন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার একটি যুগ।

বাংলাদেশে হয়তো আরও অনেক দক্ষ সাংবাদিক আসবেন। নতুন নতুন সম্পাদক আসবেন। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার নতুন অধ্যায়ও রচিত হবে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, দেশবরেণ্য অনুসন্ধানী সাংবাদিক সাঈদুর রহমান রিমনের মতো আর একজন রিমন হয়তো আর আসবেন না। তার কর্ম, তার আদর্শ, তার সাহস এবং তার বিনয় আগামী প্রজন্মের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।

কিছু মানুষ সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যান না; সময়ই একদিন তাদের কাছে ফিরে আসে। সাঈদুর রহমান রিমন তেমনই এক নাম।

গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি আমার শিক্ষাগুরু, দেশবরেণ্য অনুসন্ধানী সাংবাদিক সাঈদুর রহমান রিমনকে। মহান আল্লাহ তা’আলা তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন, আমিন।

— আজিজুল ইসলাম যুবরাজ
সম্পাদক, কাল প্রকাশ

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬ | Globe kalprakash.com

একজন সাঈদুর রহমান রিমনের বিদায়, এক যুগের অবসান

বিস্তারিত কমেন্টে