রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় প্রশাসনের একাধিক অভিযান ও জরিমানার পরও বন্ধ হচ্ছে না ভেজাল ও অনুমোদনহীন গুড় উৎপাদনের কারখানাগুলো। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাত হলেই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রমরমাভাবে ভেজাল গুড় উৎপাদন শুরু হয়। এসব গুড়ে চিনি, দীর্ঘদিনের সংরক্ষিত মিষ্টির শিরা, পচা মিষ্টি, রাসায়নিক রং এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর কেমিক্যাল মেশানো হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
স্থানীয়দের দাবি, কয়েকবার ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালিত হলেও অজ্ঞাত কারণে ভেজাল গুড় উৎপাদনকারীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে আরও কঠোর নজরদারি ও স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
জানা যায়, ২০২১ সালের ২২ ডিসেম্বর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমাতুজ জোহরা, ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল হাসান মৃধা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সিলগালা করেন। তবে কিছুদিন পরই আবারও উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়।
এছাড়া ২০২৫ সালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিকাশ চন্দ্র বর্মনের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে মিল্লাদ ট্রেডার্সকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হলেও ভেজাল গুড় উৎপাদন বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে মিল্লাদ ট্রেডার্সের মালিক দাবি করেন, তারা চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ এলাকার মালিহা এন্টারপ্রাইজ থেকে গুড় ক্রয় করেন এবং তাদের কাছে বিএসটিআইয়ের ছাড়পত্র রয়েছে। তিনি বিএসটিআইয়ের একটি অনুমোদনপত্রও প্রদর্শন করেন। তবে সরেজমিনে দেখা যায়, পণ্যের মোড়ক বা কার্টনে বিএসটিআইয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
গত ৩১ আগস্ট ২০২৫ সালে মিঠাপুকুর উপজেলার শুকুরেরহাট এলাকায় একটি ভেজাল গুড় তৈরির কারখানায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান। অভিযানে বিপুল পরিমাণ ভেজাল গুড়, গুড় তৈরির ক্ষতিকর উপকরণ, প্লাস্টিকের ব্যাগ ও বস্তা উদ্ধার করা হয়। পরে জব্দকৃত ভেজাল গুড় ধ্বংস করা হয়।
এ সময় কারখানার মালিক মোরসালিন রহমান ছোটনকে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর ৩২ ধারা এবং বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ৬(ক) ধারা অনুযায়ী দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
এরপর ২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আশিক জামানের নেতৃত্বে পরিচালিত আরেকটি অভিযানে ভেজাল গুড় উৎপাদনকারী দুটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত গুড় ও সরঞ্জাম ধ্বংস করা হয়। একই সঙ্গে একজনকে তিন লাখ টাকা জরিমানা এবং অপর একজনকে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অভিযানের প্রভাব সাময়িক। দুই-একদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও পরে আবারও উৎপাদন শুরু হয়ে যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাবেক গুড় ব্যবসায়ী বলেন, “অন্যদের দেখে আমিও এই ব্যবসায় জড়িয়েছিলাম। পরে বুঝতে পারি এটি পুরোপুরি ভেজালনির্ভর ব্যবসা। যেসব উপকরণ ব্যবহার করা হয়, সেগুলো মানুষের খাওয়ার উপযোগী নয়। তাই আমি এই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছি।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “প্রশাসন নিয়মিত নজরদারি করলে এতদিনে এসব কারখানা বন্ধ হয়ে যেত। বারবার অভিযান, জরিমানা ও কারাদণ্ড হলেও স্থায়ী কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।”
সাবেক ছাত্রনেতা মাজহারুল ইসলাম সাপিন বলেন, “ভেজাল গুড় উৎপাদনের বিরুদ্ধে বহুবার প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে তারা প্রকাশ্যেই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।”
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, ভেজাল ও রাসায়নিক মিশ্রিত গুড় দীর্ঘদিন খেলে ক্যানসার, আলসার, কিডনি জটিলতা এবং স্নায়বিক সমস্যাসহ বিভিন্ন গুরুতর রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. পারভেজ বলেন, “অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
মিঠাপুকুর প্রতিনিধি 

















