রংপুরের মিঠাপুকুরে আগামী ১৫ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে জিআই পণ্য স্বীকৃত বিখ্যাত হাড়িভাঙা আমের বাজারজাতকরণ। চলতি মৌসুমে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় উৎপাদিত হাড়িভাঙা আম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানির প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। কৃষক, ব্যবসায়ী এবং কৃষি বিভাগ আশা করছে, এ বছর আম বিক্রির মাধ্যমে প্রায় ১১৭ কোটি টাকার বাণিজ্য হবে।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মিঠাপুকুরে প্রায় ১,৪০০ হেক্টর জমিতে আমের বাগান রয়েছে। এর মধ্যে ১,২৬০ হেক্টর জমিতে হাড়িভাঙা আম এবং বাকি ১৪০ হেক্টরে বারি-৪, ব্যানানা, মিয়াজাকি, গৌরমতি, কাটিমনসহ বিভিন্ন উন্নত জাতের আম চাষ করা হয়েছে।
হাড়িভাঙা আমের জন্মভূমি হিসেবে পরিচিত খোড়াগাছ ইউনিয়নে এবার প্রায় ৮০০ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, কৃষকদের নিবিড় পরিচর্যা এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির কারণে এ বছর ফলন সন্তোষজনক হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জানান, ১৫ জুন থেকে আম সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ শুরু হবে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা বাগান মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন। আমের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কার্যকর ভূমিকা কামনা করেছেন কৃষকরা।
চেংমারী ইউনিয়নের কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা হানিফ জানান, তার ইউনিয়নে এ বছর প্রায় ৩৫ হেক্টর জমিতে আমের বাগান রয়েছে। এর মধ্যে ২০ হেক্টরে হাড়িভাঙা, ১০ হেক্টরে বারি-৪ এবং ৫ হেক্টরে অন্যান্য জাতের আম উৎপাদিত হয়েছে।
অন্যদিকে ময়েনপুর ইউনিয়নের কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা আজিজ জানান, তার ইউনিয়নে প্রায় ২৫০ হেক্টর জমিতে আমের উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে ২০০ হেক্টরে হাড়িভাঙা এবং ৫০ হেক্টরে ব্যানানা, চিয়াংমাই, ফ্রুটচেক, গৌরমতি, কাটিমনসহ বিভিন্ন লেট ভ্যারাইটি আম রয়েছে। তিনি বলেন, কৃষকদের সব ধরনের পরামর্শ ও সহযোগিতা দিতে আমরা সবসময় মাঠে নিরলসভাবে কাজ করছি।
ময়েনপুর ইউনিয়নের আম চাষি মোস্তফা আল মাসুদ চৌধুরী বলেন, সরকার যদি বাজার ব্যবস্থাপনা ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মনিটরিং করে, তাহলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং আরও উৎসাহিত হবেন।
আম ব্যবসায়ী ও চাষি হয়রত আলী বলেন, আমার নিজস্ব বাগানের পাশাপাশি বাগান কিনেও ব্যবসা করি। এ বছর প্রায় ৫০ লাখ টাকার বাগান ক্রয় করেছি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবং বাজার ভালো থাকলে লাভের আশা করছি। তবে আম উৎপাদনে খরচও অনেক বেশি। ন্যায্যমূল্য না পেলে লোকসানের ঝুঁকি রয়েছে।
চেংমারী ইউনিয়নের চাষি শাখাওয়াত, শাহজাহান ও সোহাগ বলেন, হাড়িভাঙা আম উত্তরাঞ্চলের গর্ব এবং দেশের অন্যতম জনপ্রিয় জিআই পণ্য। এই আম আমাদের অঞ্চলকে দেশব্যাপী পরিচিত করেছে। তবে অতিবৃষ্টি ও খরার কারণে এ বছর পরিচর্যা ব্যয় বেড়েছে। সরকার যদি উৎপাদন ও বিপণনে আরও সহায়তা দেয়, তাহলে কৃষকরা আরও লাভবান হবেন।
এদিকে অনেক চাষি ও ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সময়ের আগেই বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে অপরিপক্ব আম বাজারে ছাড়ছেন। এতে হাড়িভাঙা আমের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা বাজার তদারকি জোরদার করার দাবি জানান।
স্বাদ, মিষ্টতা, আঁশবিহীন গঠন এবং আকর্ষণীয় রঙের কারণে মিঠাপুকুরের হাড়িভাঙা আম দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। প্রতি বছরের মতো এবারও এই আমকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং হাজারো কৃষক ও ব্যবসায়ীর জীবিকায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
kalprakash.com/SAS
মিঠাপুকুর প্রতিনিধি 
















