বাংলাদেশ ০৩:০৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
শিরোনামঃ
Logo গাছের ডাল কাটাকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলায় আহত ৭ Logo অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে পুলিশের বিশেষ অভিযান: শীর্ষ জুয়ারীসহ গ্রেফতার ১৫ Logo লামায় থামছেই না অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম, প্রশাসনের নীরব ভূমিকায় জনমনে ক্ষোভ Logo রাস্তার পাশে ছোট্ট কুটিরে বৃদ্ধ দম্পতির মানবেতর জীবন Logo তেজগাঁও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দোয়া মাহফিল Logo গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকের নিরাপত্তা ও মালিকানার সংকট Logo নবনিযুক্ত কুবি উপাচার্যকে শাখা ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের শুভেচ্ছা Logo নওগাঁ সদর উপজেলা কৃষকদলের কমিটি গঠন, আহ্বায়ক মামুন ও সদস্য সচিব সবুর Logo পাবিপ্রবির নতুন ভিসি ড. আবুল হাসনাত মোহা. শামীম Logo স্বর্ণের চেইন ও নগদ টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ, দম্পতির ওপর হামলা
পতাকা হাতে ইরানি তরুণীর অটল ঘোষণা

এ পতাকা কখনও মাটিতে পড়বে না

মেহের নিউজ এজেন্সির মেহের ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রবন্ধে এক ইরানি তরুণীর মাধ্যমে দেশপ্রেম, যুদ্ধ-পরবর্তী মানসিকতা এবং জনগণের দৃঢ়তার একটি দীর্ঘ ও প্রতীকী চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

গল্পটি শুরু হয় এক বসন্তের শহুরে পরিবেশ দিয়ে—বৃষ্টি ভেজা রাস্তা, গাছে গাছে তুঁত ফলের আভাস, আর শহরের কেন্দ্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘জিহাদ চৌরাস্তা’। এই নামটি শুধু একটি জায়গার পরিচয় নয়, বরং একটি প্রতীক—যেখানে প্রতিরোধ, সংকল্প ও জাতীয় চেতনার প্রকাশ ঘটছে।

প্রবন্ধে বলা হয়, ৯ ফারভার্দিন (২৯ মার্চ) থেকে কিছু মানুষ এই জায়গাটিকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ উদ্যোগ নেয়। তারা একটি বিশাল ইরানি পতাকা তৈরি করে এবং সেটিকে উঁচুতে ধরে রাখার অঙ্গীকার করে। তাদের বিশ্বাস, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক—যুদ্ধ দীর্ঘ হোক বা সংকট আরও বাড়ুক—এই পতাকা কখনোই মাটিতে নামতে দেওয়া যাবে না। এটি তাদের কাছে দেশের মর্যাদা ও অস্তিত্বের প্রতীক।

গল্পকার চৌরাস্তার দিকে যেতে যেতে শহরের মানুষের দিকে নজর দেন। সেখানে দেখা যায়, সাধারণ মানুষের মুখেও পরিবর্তনের ছাপ। যাদের জীবন আগে ছিল স্বাভাবিক ও দৈনন্দিন চিন্তায় ভরা, এখন তাদের চোখেমুখে যুদ্ধের ক্লান্তি, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা স্পষ্ট। তাদের মুখের রেখায় যেন দীর্ঘ সময়ের চাপ ও সংগ্রামের গল্প লেখা।

ফেরদৌসি স্কয়ার পার হওয়ার সময় পরিবেশ আরও ভারী হয়ে ওঠে। কিছু ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, কিছু জায়গায় নীরবতা আর শূন্যতা স্পষ্ট। লেখক এই দৃশ্যকে শহরের “ক্ষত” হিসেবে বর্ণনা করেন—যেন পুরো নগরী যুদ্ধের আঘাতে আহত একটি শরীর। তবে সেই ক্ষতের মাঝেও মানুষের চলাচল, ফিসফাস আর ছোট ছোট উদ্যোগ জীবনের উপস্থিতি জানান দেয়।

ধীরে ধীরে চৌরাস্তার কাছে ভিড় বাড়ে। সেখানে মানুষের উপস্থিতি, ব্যস্ততা ও আন্দোলন শহরের হারানো প্রাণ আবার ফিরিয়ে আনার মতো মনে হয়। যুদ্ধের কারণে যে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল, তা এখন ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে। বাতাস, শব্দ আর মানুষের পদচারণা মিলিয়ে একটি নতুন জীবনের ইঙ্গিত তৈরি হয়।

এই পরিবেশের মধ্যেই বর্ণনাকারী একটি উড়ন্ত ইরানি পতাকা লক্ষ্য করেন। কাছে গিয়ে দেখা যায়, এক তরুণী দৃঢ়ভাবে সেটি ধরে আছেন। বাতাসে পতাকাটি দুলছে, কিন্তু তার হাত স্থির ও আত্মবিশ্বাসী। তার উপস্থিতি যেন পুরো দৃশ্যের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

তরুণীর নাম ফারিদে। তার সঙ্গে কথা বলার সময় জানা যায়, তিনি নিয়মিতভাবে এই স্থানে এসে পতাকা ধরে রাখেন। লেখক জানতে চান, এত ক্লান্তিকর সময় ও দীর্ঘদিনের চাপের মধ্যেও কী তাকে এই কাজ চালিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।

ফারিদে সহজভাবে উত্তর দেন—তার দেশের প্রতি ভালোবাসাই তাকে এখানে টেনে আনে। তার কাছে এটি শুধু একটি দায়িত্ব নয়, বরং একটি নৈতিক কর্তব্য। তিনি মনে করেন, অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও এই পতাকা ধরে রাখা তার নিজের দেশকে সম্মান জানানোর একটি উপায়।

আরও প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই কাজ তার কাছে একটি “জিহাদ”—অর্থাৎ সংগ্রাম বা প্রচেষ্টা, যার মাধ্যমে তিনি নিজের দেশকে রক্ষা করার অনুভূতি পান। তার চোখে এটি শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিরোধ, যেখানে অস্ত্র নয়, বরং দৃঢ়তা ও বিশ্বাসই প্রধান শক্তি।

চারপাশে তখন গাড়ির হর্ন, মানুষের কোলাহল আর শহরের শব্দ চলতে থাকে। কিন্তু লেখকের অনুভব হয়, এই বিশৃঙ্খলার মাঝেও ফারিদের কণ্ঠ ও উপস্থিতি সবচেয়ে স্পষ্ট। তার আত্মবিশ্বাস এমন যে তা কোনো দ্বিধার জায়গা রাখে না।

কথোপকথন শেষে লেখক কিছুটা দূরে সরে যান, কিন্তু বারবার পিছনে তাকান। ফারিদের মধ্যে তিনি শুধু একজন তরুণীকে নয়, বরং এক ধরনের প্রতীকী শক্তি দেখতে পান—যেখানে দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং আশা একসাথে মিশে আছে।

প্রবন্ধের শেষদিকে এসে শহীদ বেহেশতির একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হয়, যেখানে বলা হয়েছে—একটি জাতি কঠিন পরিস্থিতিতেও মাথা নত করে না, যতক্ষণ না মৃত্যু বা চরম বিপর্যয় আসে। এই উদ্ধৃতির মাধ্যমে লেখক ইঙ্গিত দেন যে, ইরানি জনগণের কাছে প্রতিরোধ ও দৃঢ়তা একটি গভীর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মূল্যবোধ।

সবশেষে প্রবন্ধটি এই ধারণা তুলে ধরে যে, যুদ্ধ, সংকট বা অস্থিরতার মধ্যেও সাধারণ মানুষের ছোট ছোট কাজ—যেমন ফারিদের পতাকা ধরে রাখা—একটি বৃহত্তর জাতীয় চেতনার প্রতীক হয়ে ওঠে। এই মানুষগুলোই ভবিষ্যতের প্রতি আশা ধরে রাখে এবং তাদের মাধ্যমেই একটি জাতির আত্মপরিচয় ও স্থিতি প্রকাশ পায়।

জনপ্রিয় সংবাদ

গাছের ডাল কাটাকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলায় আহত ৭

পতাকা হাতে ইরানি তরুণীর অটল ঘোষণা

এ পতাকা কখনও মাটিতে পড়বে না

প্রকাশিত: ০৮:৩০:৪৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬

মেহের নিউজ এজেন্সির মেহের ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রবন্ধে এক ইরানি তরুণীর মাধ্যমে দেশপ্রেম, যুদ্ধ-পরবর্তী মানসিকতা এবং জনগণের দৃঢ়তার একটি দীর্ঘ ও প্রতীকী চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

গল্পটি শুরু হয় এক বসন্তের শহুরে পরিবেশ দিয়ে—বৃষ্টি ভেজা রাস্তা, গাছে গাছে তুঁত ফলের আভাস, আর শহরের কেন্দ্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘জিহাদ চৌরাস্তা’। এই নামটি শুধু একটি জায়গার পরিচয় নয়, বরং একটি প্রতীক—যেখানে প্রতিরোধ, সংকল্প ও জাতীয় চেতনার প্রকাশ ঘটছে।

প্রবন্ধে বলা হয়, ৯ ফারভার্দিন (২৯ মার্চ) থেকে কিছু মানুষ এই জায়গাটিকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ উদ্যোগ নেয়। তারা একটি বিশাল ইরানি পতাকা তৈরি করে এবং সেটিকে উঁচুতে ধরে রাখার অঙ্গীকার করে। তাদের বিশ্বাস, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক—যুদ্ধ দীর্ঘ হোক বা সংকট আরও বাড়ুক—এই পতাকা কখনোই মাটিতে নামতে দেওয়া যাবে না। এটি তাদের কাছে দেশের মর্যাদা ও অস্তিত্বের প্রতীক।

গল্পকার চৌরাস্তার দিকে যেতে যেতে শহরের মানুষের দিকে নজর দেন। সেখানে দেখা যায়, সাধারণ মানুষের মুখেও পরিবর্তনের ছাপ। যাদের জীবন আগে ছিল স্বাভাবিক ও দৈনন্দিন চিন্তায় ভরা, এখন তাদের চোখেমুখে যুদ্ধের ক্লান্তি, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা স্পষ্ট। তাদের মুখের রেখায় যেন দীর্ঘ সময়ের চাপ ও সংগ্রামের গল্প লেখা।

ফেরদৌসি স্কয়ার পার হওয়ার সময় পরিবেশ আরও ভারী হয়ে ওঠে। কিছু ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, কিছু জায়গায় নীরবতা আর শূন্যতা স্পষ্ট। লেখক এই দৃশ্যকে শহরের “ক্ষত” হিসেবে বর্ণনা করেন—যেন পুরো নগরী যুদ্ধের আঘাতে আহত একটি শরীর। তবে সেই ক্ষতের মাঝেও মানুষের চলাচল, ফিসফাস আর ছোট ছোট উদ্যোগ জীবনের উপস্থিতি জানান দেয়।

ধীরে ধীরে চৌরাস্তার কাছে ভিড় বাড়ে। সেখানে মানুষের উপস্থিতি, ব্যস্ততা ও আন্দোলন শহরের হারানো প্রাণ আবার ফিরিয়ে আনার মতো মনে হয়। যুদ্ধের কারণে যে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল, তা এখন ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে। বাতাস, শব্দ আর মানুষের পদচারণা মিলিয়ে একটি নতুন জীবনের ইঙ্গিত তৈরি হয়।

এই পরিবেশের মধ্যেই বর্ণনাকারী একটি উড়ন্ত ইরানি পতাকা লক্ষ্য করেন। কাছে গিয়ে দেখা যায়, এক তরুণী দৃঢ়ভাবে সেটি ধরে আছেন। বাতাসে পতাকাটি দুলছে, কিন্তু তার হাত স্থির ও আত্মবিশ্বাসী। তার উপস্থিতি যেন পুরো দৃশ্যের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

তরুণীর নাম ফারিদে। তার সঙ্গে কথা বলার সময় জানা যায়, তিনি নিয়মিতভাবে এই স্থানে এসে পতাকা ধরে রাখেন। লেখক জানতে চান, এত ক্লান্তিকর সময় ও দীর্ঘদিনের চাপের মধ্যেও কী তাকে এই কাজ চালিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।

ফারিদে সহজভাবে উত্তর দেন—তার দেশের প্রতি ভালোবাসাই তাকে এখানে টেনে আনে। তার কাছে এটি শুধু একটি দায়িত্ব নয়, বরং একটি নৈতিক কর্তব্য। তিনি মনে করেন, অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও এই পতাকা ধরে রাখা তার নিজের দেশকে সম্মান জানানোর একটি উপায়।

আরও প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই কাজ তার কাছে একটি “জিহাদ”—অর্থাৎ সংগ্রাম বা প্রচেষ্টা, যার মাধ্যমে তিনি নিজের দেশকে রক্ষা করার অনুভূতি পান। তার চোখে এটি শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিরোধ, যেখানে অস্ত্র নয়, বরং দৃঢ়তা ও বিশ্বাসই প্রধান শক্তি।

চারপাশে তখন গাড়ির হর্ন, মানুষের কোলাহল আর শহরের শব্দ চলতে থাকে। কিন্তু লেখকের অনুভব হয়, এই বিশৃঙ্খলার মাঝেও ফারিদের কণ্ঠ ও উপস্থিতি সবচেয়ে স্পষ্ট। তার আত্মবিশ্বাস এমন যে তা কোনো দ্বিধার জায়গা রাখে না।

কথোপকথন শেষে লেখক কিছুটা দূরে সরে যান, কিন্তু বারবার পিছনে তাকান। ফারিদের মধ্যে তিনি শুধু একজন তরুণীকে নয়, বরং এক ধরনের প্রতীকী শক্তি দেখতে পান—যেখানে দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং আশা একসাথে মিশে আছে।

প্রবন্ধের শেষদিকে এসে শহীদ বেহেশতির একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হয়, যেখানে বলা হয়েছে—একটি জাতি কঠিন পরিস্থিতিতেও মাথা নত করে না, যতক্ষণ না মৃত্যু বা চরম বিপর্যয় আসে। এই উদ্ধৃতির মাধ্যমে লেখক ইঙ্গিত দেন যে, ইরানি জনগণের কাছে প্রতিরোধ ও দৃঢ়তা একটি গভীর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মূল্যবোধ।

সবশেষে প্রবন্ধটি এই ধারণা তুলে ধরে যে, যুদ্ধ, সংকট বা অস্থিরতার মধ্যেও সাধারণ মানুষের ছোট ছোট কাজ—যেমন ফারিদের পতাকা ধরে রাখা—একটি বৃহত্তর জাতীয় চেতনার প্রতীক হয়ে ওঠে। এই মানুষগুলোই ভবিষ্যতের প্রতি আশা ধরে রাখে এবং তাদের মাধ্যমেই একটি জাতির আত্মপরিচয় ও স্থিতি প্রকাশ পায়।