ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে কর্মরত খাদ্য পরিদর্শক শাহ মাজহারুল ইসলাম কামালের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, বদলি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তার এবং আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। তাঁর নামে এবং স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের নামে বিপুল সম্পদ ও বিভিন্ন স্থানে বিনিয়োগ রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।
অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে অবস্থানের সুযোগ কাজে লাগিয়ে খাদ্য বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন, পরিবহন ঠিকাদারি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন কামাল। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, শাহ মাজহারুল ইসলাম কামাল ২০০০ সালের ২৬ ডিসেম্বর খাদ্য বিভাগে যোগ দেন। এর আগে তিনি গফরগাঁও সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং কলেজ ছাত্র সংসদের বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার এসব তথ্যের স্বাধীন নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
২০২০ সালের জুলাইয়ে ধান সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগে তাঁকে ময়মনসিংহের ফুলপুর এলএসডি থেকে প্রত্যাহার করে নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলা খাদ্য দপ্তরে পদায়ন করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। পরে তিনি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় বদলি হয়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে ডেপুটেশনে যোগ দেন বলে জানা গেছে। তবে তাঁর বর্তমান পদায়ন ও ডেপুটেশনের প্রশাসনিক নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
কামালের বিরুদ্ধে ময়মনসিংহ নগরী ও অন্যান্য এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, দোকান, বাড়ি এবং জমিতে বিনিয়োগের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের তালিকায় মফিজ উদ্দিন ইনডেক্স প্লাজার ৭সি নম্বর ফ্ল্যাট, আমলাপাড়ায় একটি ফ্ল্যাট, দুর্গাবাড়ী রোডে একটি দোকান এবং কাঁচিঝুলিতে দুই ভাইয়ের নামে ছয়তলা ভবনের চারতলা নির্মাণের তথ্য রয়েছে। নতুন বাজারের ফারহান কমপ্লেক্সে দুটি ফ্ল্যাট বুকিং এবং গফরগাঁওয়ের জামতলা মোড় ও ইমামবাড়ী ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন এলাকায় একাধিক দোকান থাকারও অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকার উত্তরা এলাকায় একটি ফ্ল্যাট এবং ময়মনসিংহের ঢাকা বাইপাস এলাকায় বন্ধুদের সঙ্গে যৌথভাবে কেনা জমিতে তাঁর কয়েকটি শেয়ার রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
এসব সম্পদের মালিকানা, ক্রয়ের অর্থের উৎস এবং কামালের ঘোষিত আয় ও সম্পদের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট জমির দলিল, নামজারি, আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব ও অন্যান্য আর্থিক নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা মেট্রো-গ-৪৩-২৬৪৭ নম্বরের একটি টয়োটা প্রিমিও গাড়ি কামাল নিয়মিত ব্যবহার করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, গাড়িটি ময়মনসিংহ খাদ্য বিভাগের পরিবহন ঠিকাদার ও সাবেক যুবলীগ নেতা আবু বকর সিদ্দিক ওরফে আজাদের নামে নিবন্ধিত। গাড়িটি মফিজ উদ্দিন ইনডেক্স প্লাজার গ্যারেজে রাখা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে গাড়িটির প্রকৃত মালিকানা, ব্যবহারকারীর সঙ্গে মালিকের সম্পর্ক এবং গাড়িটি কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, এসব বিষয়ে বিআরটিএর নথি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অভিযোগ, কামাল খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তার করেন। পরিবহন ঠিকাদার নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে তদবির-বাণিজ্যের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, কেউ তাঁর কথামতো কাজ না করলে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট নথি বা প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
ময়মনসিংহ নগরীর নতুন বাজার কাঁচাবাজার এলাকায় খাদ্য পরিদর্শক সমিতির কার্যালয়ে নিয়মিত জুয়ার আসর বসার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সেখানে একজন ‘বিডার’ হিসেবে কামাল প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য অর্থ পান।
তবে জুয়ার আসর, অর্থ লেনদেন কিংবা কামালের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো অভিযান, মামলা বা আনুষ্ঠানিক তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি ঢাকায় প্রশিক্ষণে আছি। এগুলোর খোঁজ নেব।’
ময়মনসিংহ আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক আশরাফুল আলম বলেন, শাহ কামাল তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার আগেই জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। তাঁর সময়ে কামালের ডেপুটেশনসংক্রান্ত কোনো আদেশ হয়নি বলেও জানান তিনি। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
অন্যদিকে শাহ মাজহারুল ইসলাম কামালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য, প্রতিবেদনে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলোর কোনোটি সত্য নয়।
কামালের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের পদায়ন ও ডেপুটেশনের প্রশাসনিক নথি, বদলি-পদায়নসংক্রান্ত কার্যক্রম, ঠিকাদারি সংশ্লিষ্টতা, আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, জমি ও ফ্ল্যাটের মালিকানা এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগগুলো সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তাঁকে দায়মুক্ত করার জন্য নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
kalprakash.com/IM