একটি অস্থায়ী চেকপয়েন্ট। সেখানেই আটকে যাচ্ছে মোটরবাইক, ব্যবসায়ী, এমনকি মানুষের জীবনও। চেকপয়েন্টটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হাকিমপুরের একটি গ্রামের সড়কে। সেখানে বোরকা পরা দুই তরুণী অপেক্ষা করছেন। এক সীমান্তরক্ষী তাঁদের পিঠ থেকে ব্যাগ নামিয়ে তন্নতন্ন করে দেখছেন। তাঁদের পেছনে প্রায় এক কিলোমিটার প্রশস্ত একটি অস্বস্তিকর বাফার জোন। এটি এখনো ভারতীয় ভূখণ্ডের ভেতরেই, তবে এখানে মানুষের স্বাভাবিক স্বাধীনতা নেই। তবে অনেক সীমান্তবর্তী এলাকার মতো এটি নো-ম্যানস-ল্যান্ড নয়। এই বাফার জোনে থাকা সাতটি গ্রামে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ বসবাস করে।
সীমান্তে বাড়তে থাকা বিধিনিষেধ ও তল্লাশি নিয়ে জানতে গেলে বিখ্যাত সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিনিধিদের কাছে অভিযোগ জানাতে মানুষের ভিড় জমে যায়।
এই বাফার জোনটি মূলত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশ থেকে আসা তথাকথিত অনুপ্রবেশকারীদের ঠেকানোর জন্য। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ভাষ্য, এসব মানুষ ভারতের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও জনমিতিক ভারসাম্যের জন্য হুমকি। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ‘প্রত্যেক বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে উল্টো করে ঝুলিয়ে দেবেন’ এবং তাঁদের ‘উইপোকার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন।
নিঃসন্দেহে ভারতে বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই বসবাসকারী বিদেশির সংখ্যা অনেক, সম্ভবত কয়েক মিলিয়ন। তাঁদের কিছু আবার বাংলাদেশিও। কিন্তু ভারত সরকার ২ কোটি পর্যন্ত এমন মানুষের চাঞ্চল্যকর হিসাব উল্লেখ করেছে এবং শপথ করে বলছে, তাঁদের সবাইকে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে। সম্প্রতি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে অমিত শাহ বলেছেন, ভারত কোনো ধর্মশালা বা দাতব্য অতিথিশালা নয়।
এ বিবেচনায় তিনি ঠিকই বলেছেন—ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকা এখন অনেকটা খোলা আকাশের নিচে পরিচালিত এক বিশাল কারাগারের মতো। সীমান্তে কাটাতারের বেড়া দেওয়া হয়েছে। কোনো বিচার-বিশ্লেষণ বা বাস্তবতার ধারণা ছাড়াই যেখানে বেড়া দেওয়া সম্ভব নয়, সেখানে নদীপথে সীমান্ত পাহারার জন্য সাপ ও কুমির ব্যবহারের কথাও ভারতের তরফ থেকে বলা হয়েছিল। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের হাতে প্রায় তিন ডজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। বাংলাদেশিরা তো নিহত হচ্ছেনই, কিন্তু সীমান্তের উত্তেজনাপূর্ণ রাজনীতির ফাঁদে ভারতীয়রাও আটকা পড়েছেন।
ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার ৪ হাজার ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত বিশ্বের দীর্ঘতম সীমান্তগুলোর একটি এবং সবচেয়ে অরক্ষিত সীমান্তগুলোরও একটি। ঔপনিবেশিক ইতিহাস কয়েক কোটি বাঙালিকে আলাদা আলাদা দেশে ভাগ করে দিয়েছে। কিন্তু এখনো অনেক মানুষ সীমান্তের এপার-ওপার যাতায়াত করেন। কিছু বাড়ির রান্নাঘর ভারতে, আর শোবার ঘর বাংলাদেশে।
দোকানদার টনি সরদার তাঁর ফোনে এমন এক নৌকাবাইচের ভিডিও দেখান, যেখানে নদীর যে অংশটি অনায়াসে সাঁতরে পার হওয়া যায়, তার ওপারে থাকা বাংলাদেশিরা ভারতীয় মাঝিদের উৎসাহ দিচ্ছেন। চলতি বসন্তে সেই নৌকাবাইচ বন্ধ হয়ে গেছে। ২০১৪ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জাতীয়ভাবে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সীমান্তনীতি আরও কঠোর হয়েছে। কিন্তু এপ্রিলে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় নিয়মকানুন ও রাজনৈতিক বক্তব্য আরও কদর্য হয়ে ওঠে।
রাজ্যে প্রথমবারের মতো জয়ী হয়ে বিজেপি বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পাঁচটি ভারতীয় রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড়টির—পশ্চিমবঙ্গের—নিয়ন্ত্রণ নেয়। আগস্টে অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সীমান্তবর্তী শহরগুলোতে নতুন একটি করে গোয়েন্দা ইউনিট মোতায়েন করা হবে। তাদের কাজ হবে উগ্রপন্থী ও চোরাকারবারিদের ওপর নজর রাখা। বিজেপি নির্বাচনী প্রচারণায় তথাকথিত বাংলাদেশিদের পুশব্যাক নিয়েও প্রচার চালিয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাভাষী মুসলিমদের—যাঁদের বাংলাদেশি বলে অভিযোগ করা হয়—ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে ধরে বাসে করে সীমান্তবর্তী শহরগুলোতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং কোনো ধরনের যোগাযোগ বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। তাৎক্ষণিকভাবে বানানো এই পদ্ধতিতে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া উপেক্ষা করা হয়।
সমালোচনা হলেও তাতে পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দমে যাননি। তিনি পুলিশকে আটক ব্যক্তিদের সরাসরি সীমান্তরক্ষীদের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। জুনের শেষ নাগাদ তিনি তাঁর আমলে ১০ হাজার পুশব্যাক হয়েছে বলে গর্ব করে জানান। পর্যবেক্ষকদের মতে, সংখ্যাটি প্রায় ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার। এখন বাংলাদেশও নিজ সীমান্তে টহল জোরদার করায় তাঁদের অধিকাংশকে আটককেন্দ্র অথবা বাফার জোনে পাঠানো হচ্ছে।
যাঁদের নির্বাসিত করা হচ্ছে, তাঁদের প্রায় সবাই মুসলিম। শুধু বাংলা ভাষায় কথা বলা এবং মক্কার দিকে মুখ করে নামাজ পড়ার কারণে তাঁদের বিদেশি বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তাঁদের কয়েকজনকে ভোটার তালিকা সংশোধনের একটি ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়ার—স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)—পর আটক করা হয়। সেই প্রক্রিয়ায় বহু বাসিন্দাকে ভোট দেওয়ার অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, ফলে তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়, যদিও তাঁরা নিজেদের নাগরিকত্বের পক্ষে উপস্থাপন করার মতো নথিপত্র দেখাতে পারেন।
একই সময়ে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, তাঁরা কাগজপত্রহীন হিন্দুদের সীমান্তরক্ষীদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে দেখেছেন। ওই হিন্দুদের আশ্বস্ত করা হয়েছে যে তাঁরা থেকে যেতে পারবেন। কারণ, বাংলাদেশে হিন্দুরা কথিতভাবে ‘ক্রমবর্ধমান হামলার শিকার’ হচ্ছেন। ২০২৪ সাল থেকে এই দ্বৈত মানদণ্ড আইনে পরিণত হয়েছে—প্রতিবেশী দেশগুলোর অমুসলিম সংখ্যালঘুরা আশ্রয়ের আবেদন করতে পারবেন এবং দ্রুত নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়ায় যেতে পারবেন।
সীমান্তে দৈনন্দিন জীবন এখন একঘেয়ে, ক্লান্তিকর ও ভীতিজনক হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রায়ই সীমান্তরক্ষীদের সঙ্গে চার-পাঁচ ঘণ্টা সময় নষ্ট করেন। তাঁরা মোটরবাইক খুলে খুলে পরীক্ষা করেন এবং খাবারের বাক্সে লাঠি বা আঙুল ঢুকিয়ে তল্লাশি চালান। শীতের কুয়াশায় কর্মকর্তারা সব সময় চেকপয়েন্টে দায়িত্ব পালনের মেজাজে থাকেন না। ফলে স্থানীয়রা সীমান্তের এপার-ওপার আটকে পড়েন। চোরাকারবারি চক্রকে ঠেকাতে যে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, সেটিও গ্রামবাসীদের খাবার, শিশুর ফর্মুলা দুধ এবং স্যানিটারি প্যাড থেকে বঞ্চিত করছে।
সীমান্তবর্তী একটি গ্রামের প্রধান আকমল গাজী বলেন, ‘আমরা কি আসলেই ভারতের অংশ?’
ভারতের রাজনীতি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও তিক্ত করে তুলেছে। এই সম্পর্ক এমনিতেই আগে থেকে অত্যন্ত নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে। দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ বলেছেন, ভারতের উচিত প্রতিবেশী বাংলাদেশকে কিছুটা ইজ্জত, অর্থাৎ সম্মান দেখানো। কিন্তু বিজেপির উইপোকা ও অনুপ্রবেশকারীর মতো শব্দের ব্যবহার দেখে মনে হয়, তাদের অভিধানে সম্মানের জন্য খুব বেশি জায়গাই রাখা হয়নি।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
kalprakash.com/IM