আইনি সহায়তা সেবা আরও সহজ, দ্রুত, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করতে ডিজিটাল পদ্ধতি চালুর সম্ভাবনা নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ে আলোচনা ও মতামত গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সময় লিগ্যাল এইডের বর্তমান সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ কী ধরনের সুবিধা পাচ্ছেন, সেবা পেতে কোনো জটিলতা বা হয়রানির শিকার হচ্ছেন কি না এবং এজন্য কোথাও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে অভিজ্ঞতার কথা শোনেন ইউএনডিপির প্রতিনিধিরা।
লিগ্যাল এইডে আইনি সহায়তা পাওয়া সেবাগ্রহীতা ও সভায় অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রতিনিধিরা। তাঁরা লিগ্যাল এইডের বর্তমান সেবা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা জানতে চান। বিশেষ করে আইনি সহায়তার আবেদন থেকে শুরু করে আইনজীবীর সহযোগিতা পাওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের জটিলতা, হয়রানি বা অতিরিক্ত খরচের মুখোমুখি হতে হয় কি না, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে ডিজিটাল মাধ্যমে লিগ্যাল এইডের আবেদন, তথ্য প্রদান ও প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলে তা সাধারণ মানুষের জন্য কতটা কার্যকর হবে, সে বিষয়েও মতামত নেওয়া হয়।
আইনি সহায়তা পাওয়া শেফালী বেগম বলেন, লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে আইনি সহায়তা পাওয়ায় আমার অনেক উপকার হয়েছে। আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল। পরে লিগ্যাল এইডে অভিযোগ দিলে তারা আমাদের দুই পক্ষকে ডেকে আপস-মীমাংসা করে দেয় এবং আমার ভাগের ৩৫ শতক জমি আমাকে বুঝিয়ে দেয়। আগে মনে হতো আইনের সহায়তা নিতে অনেক টাকাপয়সা লাগবে এবং নানা ধরনের ঝামেলায় পড়তে হবে। কিন্তু লিগ্যাল এইড থেকে সহযোগিতা পাওয়ার পর সেই ধারণা বদলেছে।
মেরিনা আক্তার বলেন, আমাদের স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ হয়েছে অনেক আগেই। শিশুসন্তান নিয়ে অনেক কষ্টে দিনযাপন করছিলাম। কোনোমতেই ভরণপোষণ দিতে রাজি হচ্ছিল না আমার স্বামী। পরে এখানে (লিগ্যাল এইড) অভিযোগ দিলে এখন আমি সন্তান বাবদ ২৫ শতাংশ ভরণপোষণ পাচ্ছি।
রমজান আলী, ইসলাম, হুমায়ুন রেজা ও বিপ্লব বলেন, আমাদের মতো ঠাকুরগাঁও লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে আইনি সহায়তা পেয়ে সাধারণ মানুষ অনেক উপকৃত হচ্ছেন। আমরাও সঠিক বিচার পেয়েছি। তবে সেবাটি আরও সহজ ও দ্রুত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে আইনি সহায়তার জন্য বারবার জেলা শহরে আসতে হয়। ডিজিটাল পদ্ধতি চালু হলে ঘরে বসেই প্রাথমিকভাবে আবেদন করা, প্রয়োজনীয় তথ্য জানা এবং সেবার অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া সম্ভব হবে। এতে মানুষের সময়, অর্থ ও ভোগান্তি তিনটিই কমবে।
ইউএনডিপির সদস্য আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ও সাথী আক্তার বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য ঠাকুরগাঁও লিগ্যাল এইড সেবা কতটা সহজ ও কার্যকর হয়েছে, তা জানতে অর্ধশত সেবা পাওয়া ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি কথা বলা হচ্ছে। সেবা নিতে গিয়ে মানুষ কোনো ধরনের জটিলতা, হয়রানি বা আর্থিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন কি না, এসব বিষয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও মতামত নেওয়া হচ্ছে।
তাঁরা আরও বলেন, মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়েই ভবিষ্যতের ডিজিটাল লিগ্যাল এইড সেবার পরিকল্পনা করা হবে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ যাতে সহজে আইনি সহায়তার জন্য আবেদন করতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা দ্রুত পেতে পারেন, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ডিজিটাল পদ্ধতি চালু হলে মানুষের সময় ও খরচ কমার পাশাপাশি লিগ্যাল এইড সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার (সিনিয়র সিভিল জজ) মজনু মিয়া বলেন, লিগ্যাল এইডের মূল উদ্দেশ্য হলো অসহায় ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষের কাছে আইনি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। অর্থের অভাবে যেন কোনো মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন, সেটিই লিগ্যাল এইডের অন্যতম লক্ষ্য। লিগ্যাল এইডের সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ডিজিটাল পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আজকের আলোচনায় সাধারণ মানুষ তাঁদের অভিজ্ঞতা ও মতামত জানিয়েছেন। এসব মতামত ভবিষ্যতে সেবার মান আরও উন্নত করতে সহায়ক হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সরাসরি লিগ্যাল এইড অফিসে এসেও মানুষ সহজেই সেবা পাচ্ছেন। তবে ভবিষ্যতে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলে দূরবর্তী এলাকার মানুষ ঘরে বসে প্রাথমিকভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে সেবার পরিধি আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।
kalprakash.com/IM