যশোরের শার্শা উপজেলায় চলতি মৌসুমে পাটের বাম্পার ফলন হলেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিয়ে চরম শঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষি বিভাগের প্রণোদনায় এবার শার্শার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে পাটের আবাদ লক্ষণীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মাঠে মাঠে এখন পাট কাটা, আঁটি বাঁধা ও জাগ দেওয়ার ব্যস্ততা চলছে। সোনালি আঁশের হাতছানিতে কৃষকের মুখে হাসি ফুটলেও শ্রমিকের চড়া মজুরি ও কৃষি উপকরণের বাড়তি দাম তাঁদের ভাবিয়ে তুলেছে।
শার্শা উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এ অঞ্চলের উর্বর দো-আঁশ মাটি পাট চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আবহাওয়া অনুকূলে থাকা, রোগবালাইয়ের প্রাদুর্ভাব কম হওয়া এবং সরকারি প্রণোদনার আওতায় বিনামূল্যে উচ্চফলনশীল বীজ ও সার বিতরণের কারণে এ বছর শার্শায় পাটের আবাদ বেড়েছে। গত মৌসুমে উপজেলায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হলেও চলতি মৌসুমে তা ৫০৩ হেক্টর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫০৩ হেক্টরে। কৃষকেরা এবার দেশি জাতের পাশাপাশি ভারতীয় কৃষি সেবাইনসহ বিভিন্ন উচ্চফলনশীল জাতের পাট আবাদ করেছেন। ফলন ভালো হওয়ায় বিঘাপ্রতি গড়ে ১০ থেকে ১৬ মণ পর্যন্ত পাট পাওয়ার আশা করছেন চাষিরা।
তবে ফলন ভালো হলেও উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি কৃষকদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাষিদের অভিযোগ, বীজ বপন থেকে শুরু করে পাট কাটা, আঁটি বাঁধা, পরিবহন এবং জাগ দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে শ্রমিকের মজুরি অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেচের জ্বালানি ও রাসায়নিক সারের বাড়তি দাম। ফলে বাজারে পাটের কাঙ্ক্ষিত দর না পেলে লাভের বদলে লোকসান ও ঋণের মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
শার্শার বাগআঁচড়া এলাকার পাটচাষি আবদুল হালিম জানান, এবার ফলন ভালো হলেও শ্রমিক ও জ্বালানি খরচের কারণে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি হয়েছে। বাজারে পাটের ভালো দাম না পেলে কৃষকের পরিশ্রমের কোনো মূল্যায়ন থাকবে না।
আরেক চাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল উৎপাদন করেও যদি উপযুক্ত দাম না পাওয়া যায়, তবে কৃষকদের দেনার দায়ে পড়তে হবে। উৎপাদন খরচের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হোসেন জানান, মৌসুমের শুরুতে বাজারে একযোগে পাটের সরবরাহ বাড়লে দাম কিছুটা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া কৃষকদের ঘরে দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় অনেকেই কম দামে পাট বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হলেও বঞ্চিত হন প্রকৃত উৎপাদকরা।
এদিকে মূল পাটের পাশাপাশি পাটখড়ি বিক্রি করে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন কৃষকেরা। জ্বালানি, ঘরের বেড়া ও ছাউনির কাজে পাটখড়ির ব্যাপক চাহিদা থাকায় স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও তা বিক্রি হচ্ছে। তবে কৃষকদের মতে, পাটের মূল বাজারদর স্থিতিশীল না থাকলে সামগ্রিকভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে শার্শা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার সাহা বলেন, সরকারি প্রণোদনা ও নিয়মিত কারিগরি পরামর্শের মাধ্যমে কৃষকদের পাট চাষে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। আঁশের গুণগত মান ভালো হলে বাজারে পাটের চাহিদা ও দাম দুটোই ভালো থাকে। এজন্য কৃষকদের সঠিক নিয়মে পরিষ্কার পানিতে পাট জাগ দেওয়া এবং ভালোভাবে ধুয়ে শুকানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। মানসম্মত পাট উৎপাদন করতে পারলে কৃষকেরা ভালো দাম পাবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
kalprakash.com/IM