সুন্দরবনের নিকটবর্তী রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ ব্যাংক বার্কলেসের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্য সরকারের ‘Office for Responsible Business Conduct’-এ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছেন বাংলাদেশ ও ভারতের তিন অভিযোগকারী।
অভিযোগকারীদের মূল বক্তব্য, রামপাল প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ সংগ্রহে বার্কলেস আর্থিক সেবা প্রদানের আগে পরিবেশ ও মানবাধিকারগত ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেনি। তাদের এ অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ‘OECD Guidelines for Multinational Enterprises on Responsible Business Conduct’-এর আলোকে দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনার বিষয়টি।
কিংস কলেজ লন্ডনের কিংস লিগ্যাল ক্লিনিকের সহায়তায় করা এ অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, বার্কলেস ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এনটিপিসি লিমিটেডের (NTPC Ltd) বিভিন্ন ঋণ ও বন্ডে আন্ডাররাইটিং সেবা দিয়েছে। পাশাপাশি ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (Exim Bank of India) বন্ড ইস্যু করার ক্ষেত্রেও ব্যাংকটির সম্পৃক্ততা ছিল। আর এই ব্যাংকই রামপাল প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ সহায়তা প্রদান করেছে।
এখানেই অভিযোগকারীদের মূল যুক্তি—কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান একটি প্রকল্পে সরাসরি অর্থায়ন না করলেও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির অর্থ সংগ্রহে আন্ডাররাইটার হিসেবে কাজ করলে সেই আর্থিক সম্পর্কের পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করা আবশ্যক।
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। ২০১৬ সালে সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্য (ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ) এলাকার ওপর সম্ভাব্য বায়ু ও পানিদূষণের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল ইউনেসকো। এ ছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাও পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনগত (ESG) ঝুঁকির কারণে প্রকল্পটিতে অর্থায়নে আপত্তি জানায়।
অভিযোগকারীদের অন্যতম পরিবেশকর্মী শরীফ জামিলের দাবি, রামপাল ও এর আশপাশের শিল্প কার্যক্রমের দূষণ নদী ও খালের মাধ্যমে সুন্দরবনের সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। সুন্দরবনের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা, নদী ও প্রাকৃতিক জলাভূমি গভীরভাবে সম্পৃক্ত থাকায় বিষয়টি কেবল বন সংরক্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
তবে এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বার্কলেসের বিরুদ্ধে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা দায় আরোপ করা হয়নি। যুক্তরাজ্যের সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রথমে অভিযোগের প্রাসঙ্গিকতা ও নথিপত্র পর্যালোচনা করবে। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি বিশদ তদন্তের জন্য গ্রহণ করা হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এই প্রাথমিক মূল্যায়ন কোনোভাবেই অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্ত প্রমাণ করে না।
এদিকে বার্কলেস কর্তৃপক্ষ এবং রামপাল প্রকল্পের স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (BIFPCL) এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
পরিবেশকর্মীদের মতে, এ অভিযোগের তাৎপর্য কেবল রামপাল প্রকল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য সংকটের এই সময়ে বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো প্রকল্পে আর্থিক সেবা দেওয়ার আগে তার দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করলে ভবিষ্যতে ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পে পুঁজির প্রবাহ রোধ করা সম্ভব হবে। সুন্দরবন সুরক্ষায় স্থানীয় তৎপরতার পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থায়ন ব্যবস্থার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবিই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে বার্কলেসের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ।
kalprakash.com/IM