সিরাজগঞ্জে সরকারি দপ্তর ও সার ডিলাররা পর্যাপ্ত মজুত থাকার দাবি করলেও মাঠপর্যায়ে তীব্র সার সংকটের মুখে পড়েছেন সাধারণ কৃষকেরা। কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারদের দ্বারে দ্বারে ৫ থেকে ৭ দিন ঘুরেও চাহিদামতো সার মিলছে না; আর পাওয়া গেলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অত্যন্ত নগণ্য। পাশাপাশি খুচরা ডিলারদের বিরুদ্ধে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
যদিও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) এবং ডিলাররা বলছেন—আগস্টের শেষদিন পর্যন্ত গুদামে সারের পর্যাপ্ত মজুত ছিল এবং চলতি সেপ্টেম্বর মাসের নতুন বরাদ্দও এসে পৌঁছেছে।
বিএডিসি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি সেপ্টেম্বর মাসে জেলার ১০৫ জন বিএডিসি ডিলারের বিপরীতে ৯৮৮ মেট্রিক টন টিএসপি, ১ হাজার ৬০৬ মেট্রিক টন ডিএপি এবং ১ হাজার ৭৭ মেট্রিক টন এমওপি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১৪৮ জন বিসিআইসি ডিলারের বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ৬২৮ মেট্রিক টন ইউরিয়া। আগামী ৭ থেকে ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ডিলাররা নির্ধারিত বাফার গোডাউন ও পয়েন্ট থেকে এসব সার উত্তোলন করবেন।
সরকারি নির্ধারিত নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতি ৫০ কেজি ওজনের ইউরিয়া ও টিএসপির বস্তা ডিলার পর্যায়ে ১ হাজার ২৫০ টাকায় কিনে কৃষকদের কাছে ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি করতে হবে। এমওপি ডিলার পর্যায়ে ৯০০ টাকায় কিনে কৃষকের কাছে ১ হাজার টাকায় এবং ডিএপি ডিলার পর্যায়ে ৯৫০ টাকায় কিনে কৃষকদের কাছে ১ হাজার ৫০ টাকায় বিক্রির বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
তবে সদর উপজেলার বহুলী, খোকশাবাড়ী, সয়দাবাদ, মেছড়া এবং রায়গঞ্জ উপজেলার নলকা ইউনিয়নের কৃষকদের সাথে কথা বলে সরকারি হিসাবের বিপরীত এক করুণ চিত্র পাওয়া গেছে।
বহুলী ইউনিয়নের বিল গজারিয়া গ্রামের কৃষক মোজাম্মেল ফকির জানান, আট বিঘা জমিতে তিনি চাষাবাদ করছেন। ডিলারদের কাছে টানা দশ দিন ধরে ঘুরেও কোনো সার পাননি। সার না পাওয়ায় ক্ষেতের ধানের চারা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ডিলাররা বলছেন—সরকার সার দিচ্ছে না, তাই তাঁরাও দিতে পারছেন না।
সয়দাবাদের মাইঝাইল গ্রামের কৃষক আরমান ও আসলা উদ্দিন জানান, ডিলারদের কাছে প্রয়োজনীয় সার মিলছে না। যেটুকু সার দেওয়া হচ্ছে, তা দিয়ে কোনোমতে চাষাবাদ টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে।
একই এলাকার কৃষক মুকুল ফকির ও লিটন অভিযোগ করে বলেন, দফায় দফায় ঘুরেও ডিলারদের কাছে সার মেলে না। কারও ৫০ কেজি সারের প্রয়োজন হলে তাকে মাত্র ১০ কেজি দেওয়া হচ্ছে। আবার এই ১০ কেজি সারেও বস্তাপ্রতি হিসাবের চেয়ে ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেশি হাতিয়ে নিচ্ছেন খুচরা বিক্রেতারা।
ডুমুর গোলামী এলাকার কৃষক আব্দুল মমিন শেখ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার এক বস্তা (৫০ কেজি) সার দরকার ছিল, কিন্তু আমাকে দিয়েছে মাত্র ১০ কেজি। তাও আবার প্রতি বস্তা ১৫০০ টাকা হিসাব ধরে বাড়তি দাম নেওয়া হয়েছে।’ আব্দুস সামাদ ও রবিউল আলম নামে আরও দুই কৃষক জানান, জমিতে সময়মতো ইউরিয়া দিতে না পারায় ফসল নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অথচ ডিলারদের কাছে গেলে বলা হচ্ছে সার নেই।
তবে এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন সার ডিলার ফরহাদ হোসেন, লুৎফর রহমান, ইজাব আলী ও মিজানুর রহমান। তাঁদের দাবি, সরকারি নির্ধারিত মূল্যেই সার বিক্রি করা হচ্ছে এবং গুদামে আগস্টের সারই এখনো অবিক্রীত রয়েছে। নতুন করে সেপ্টেম্বরের বরাদ্দ আসায় জেলায় কোনো সারের ঘাটতি নেই। কৃষকদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বর সংরক্ষণ করেই সুষমভাবে সার বিতরণ করা হচ্ছে।
kalprakash.com/IM