মাত্র ৮ সেকেন্ড—ঠিক এই সামান্য সময়ের ব্যবধানে নিজের জীবন বাজি রেখে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে এক নবজাতককে বাঁচিয়েছিলেন পাকিস্তানের নার্স রাজিয়া নূরিন। সেই আট সেকেন্ডের অসীম সাহস তাঁকে রাতারাতি দেশজুড়ে জাতীয় বীরের মর্যাদা এনে দিয়েছে। তবে বীরোচিত এই স্বীকৃতির আড়ালে সেই মুহূর্ত থেকেই তাঁকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফিরছে আরও ১৪টি নিষ্পাপ শিশুর স্মৃতি, যাদের তিনি আগুনের লেলিহান শিখা থেকে বাঁচাতে পারেননি।
গালফ নিউজের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, অসামান্য আত্মত্যাগ ও সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবে পাকিস্তান সরকার রাজিয়া নূরিনকে দেশটির অন্যতম সর্বোচ্চ ও মর্যাদাপূর্ণ বেসামরিক পদক ‘সিতারা-ই-খিদমত’ (সেবার তারকা) প্রদানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে এককালীন বিশেষ আর্থিক পুরস্কারও দেওয়া হবে।
ঘটনাটি ঘটে গত ২৬ আগস্ট পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসের (পিআইএমএস) নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে। সেদিন ওয়ার্ডটিতে ভর্তি থাকা ১৫টি শিশুর সার্বিক দেখভালের দায়িত্বে একাই ছিলেন রাজিয়া নূরিন। পাশের একটি কক্ষে যখন তিনি ইনজেকশন প্রস্তুত করছিলেন, হঠাৎ করেই নবজাতক কক্ষে দাউ দাউ করে আগুন ছড়িয়ে পড়তে দেখেন। কোনো দ্বিধা না করে হাতের সিরিঞ্জ ফেলে তিনি আগুনের ভেতরের দিকে ছুটে যান।
কক্ষের ভেতরে ঢুকে এক শিশুকে কোলে তুলে পরম মমতায় নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরেন, যেন আগুনের তাপ ও বিষাক্ত ধোঁয়া থেকে নিজের শরীর দিয়েই শিশুটিকে আড়াল করে রাখতে পারেন। এরপর ক্ষিপ্র গতিতে নবজাতককে নিয়ে ধোঁয়াটে কক্ষ থেকে বাইরে বেরিয়ে আসেন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, পুরো এই দুঃসাহসিক উদ্ধার অভিযান সম্পন্ন করতে তাঁর সময় লেগেছিল মাত্র আট সেকেন্ড।
বাইরে বের হয়ে শিশুটিকে এক চিকিৎসকের কোলে তুলেই মুহূর্তের মধ্যে পুনরায় আগুনের ভেতর ফিরে যান নূরিন। তিনি বলেন, ‘আমি বাকি শিশুদেরও বাঁচাতে চেয়েছিলাম, আমি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশা ছাড়িনি।’
কিন্তু ততক্ষণে ঘন কালো ধোঁয়ায় পুরো কক্ষ অন্ধকার হয়ে যায়। নূরিন ও অপর এক নার্স মেঝেতে হামাগুড়ি দিয়ে ভেতরে ঢোকার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু বিষাক্ত ধোঁয়ায় চারপাশ সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে পড়ে এবং দম বন্ধ হয়ে শ্বাস নেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এরপরও তাঁরা চেষ্টা চালিয়ে যান। তবে আগুনের তীব্রতায় শেষ পর্যন্ত বাকি ১৪টি নবজাতক সেখানেই প্রাণ হারায়। বেঁচে যায় শুধু সেই একটি শিশু, যাকে নিজের জীবনের বিনিময়ে নূরিন বুক দিয়ে আগলে বাইরে নিয়ে এসেছিলেন।
এক শিশুর প্রাণরক্ষার স্বস্তি আর বাকি ১৪টি শিশুকে চোখের সামনে হারানোর গভীর ক্ষত ও বুকভাঙা বেদনা আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে রাজিয়া নূরিনকে। দেশের মানুষ হয়তো তাঁকে জাতীয় বীর হিসেবে স্মরণ রাখবে, কিন্তু সেই ৮ সেকেন্ডের স্মৃতি রাজিয়া নূরিনকে হয়তো তাড়া করে ফিরবে সারাটি জীবন।
kalprakash.com/IM