গুনাহের একটি ভয়ংকর দিক হলো, একটি গুনাহ আরেকটি গুনাহকে ডেকে আনে। মানুষ হয়তো মনে করে, সে কেবল একটি ভুল করেছে; অথচ সে জানে না, সেই একটি গুনাহের সঙ্গে তার হৃদয়ে আরও কয়েকটি মারাত্মক অপরাধের জন্ম হয়েছে। গুনাহ করার পর তার সঙ্গে যা যুক্ত হয়, তা কখনো কখনো মূল গুনাহের চেয়েও অধিক ক্ষতিকর ও ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। যেমন:
১. ফেরেশতাদের সামনে লজ্জা না থাকা: মানুষ যখন গুনাহ করে, তখন তার ডানে ও বাঁয়ে সম্মানিত ফেরেশতারা অবস্থান করেন, যারা তার প্রতিটি আমল লিখে রাখছেন। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের ওপর রয়েছে সংরক্ষণকারী ফেরেশতা—সম্মানিত লেখকেরা। তারা জানে তোমরা যা করো।’ (সুরা আল-ইনফিতার, আয়াত: ১০-১২)
২. গুনাহ করতে আনন্দ পাওয়া ও হাসাহাসি করা: গুনাহ হয়ে যাওয়ার পর অনুতপ্ত হওয়া এক বিষয়, আর গুনাহে লিপ্ত থাকা অবস্থায় আনন্দ পাওয়া বা হাসাহাসি করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বান্দা যদি সত্যিই অনুভব করত যে আল্লাহ তাকে দেখছেন, তবে পাপে এমন আনন্দ আসত না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে, তখন সে পূর্ণাঙ্গ মুমিন অবস্থায় তা করে না; চোর যখন চুরি করে, তখন সে পূর্ণাঙ্গ মুমিন অবস্থায় চুরি করে না; আর মদপানকারী যখন মদ পান করে, তখন সে পূর্ণাঙ্গ মুমিন অবস্থায় তা করে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৭৮২)। এর অর্থ এই নয় যে গুনাহ করলেই মানুষ ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়; বরং গুনাহের সময় তার ঈমানের পূর্ণতা নষ্ট হয়ে যায়।
৩. গুনাহ করার সুযোগ পেয়ে আনন্দিত হওয়া: কোনো হারাম কাজের সুযোগ পেয়ে মনে মনে খুশি হওয়া চরম আত্মিক বিপদের লক্ষণ। ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, ‘গুনাহের কারণে আনন্দিত হওয়া প্রমাণ করে যে সে গুনাহের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট এবং যার অবাধ্যতা করছে তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে অজ্ঞ। গুনাহের প্রতি এই আনন্দ অনেক সময় গুনাহ করার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর। একজন মানুষ দুর্বলতার কারণে ভুল বা গুনাহ করে ফেলতে পারে; কিন্তু গুনাহ করার পর যদি তার হৃদয় বলে, “আহা! কী আনন্দ!”, তাহলে তার বিপদ আরও গভীর।’ (মাদারিজুস সালিকিন)
৪. গুনাহ করার সুযোগ না পেয়ে দুঃখ পাওয়া: একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো গুনাহের সুযোগ হাতছাড়া হলে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করা। কিন্তু কেউ যদি কোনো হারাম কাজ করতে না পেরে আফসোস বা কষ্ট পায়, তবে বুঝতে হবে তার হৃদয় এখনো সেই গুনাহকে ভালোবাসে। আল্লাহ মুত্তাকিদের প্রশংসা করে বলেন, ‘তারা যখন কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেলে অথবা নিজেদের ওপর জুলুম করে, তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে… আর তারা জেনেশুনে নিজেদের কৃতকর্মের ওপর অবিচল থাকে না।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৫)। কাজেই ভুল হয়ে গেলে অনুতপ্ত হয়ে তওবা করাই মুমিনের আসল পরিচয়। গুনাহে নিমজ্জিত থাকা নয়; বরং পাপের পর উঠে দাঁড়িয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই প্রকৃত সফলতা।
৫. সৃষ্টিকে ভয় করা, অথচ সৃষ্টিকর্তাকে ভয় না করা: মানুষ অনেক সময় লোকলজ্জা বা মানুষের ভয়ে ভীত থাকে। লোকে কী বলবে—সেই চিন্তায় প্রকাশ্যে অনেক কিছু ছেড়ে দিলেও আড়ালে পাপাচারে লিপ্ত হয়। কেউ দেখে ফেলবে—এই আশঙ্কায় দরজার পর্দা সামান্য নড়লেও কেঁপে ওঠে; অথচ সর্বদ্রষ্টা আল্লাহ যে তাকে দেখছেন, সে ব্যাপারে অন্তরে কোনো ভয় জাগে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাঁকে যথার্থ ভয় করে।’ (সুরা ফাতির, আয়াত: ২৮)। যে ব্যক্তি সঠিকভাবে আল্লাহকে চেনে, সে আল্লাহকে ভয় করে। আর যে অবাধ্য হতে হতে বেপরোয়া হয়ে ওঠে, তার অন্তর এমন অবস্থায় পৌঁছায় যে সে সৃষ্টিকে ভয় করলেও সৃষ্টিকর্তাকে ভয় করে না।
অতএব, কোনো পাপকেই ছোট মনে করা যাবে না; কারণ ছোট ছোট গুনাহ জমতে জমতেই একদিন তা পাহাড়ে রূপ নেয়। পাশাপাশি বড় বড় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। মহান আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, ‘তোমাদের যে বড় বড় গুনাহ করতে নিষেধ করা হয়েছে, তোমরা যদি সেগুলো থেকে বেঁচে থাকো, তবে আমি তোমাদের ছোটখাটো গুনাহগুলো মোচন করে দেব এবং তোমাদের সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করাব।’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত: ৩১)
kalprakash.com/IM