সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬ | ১৫ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ১৭ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ | বিকাল ৫:১২:৫৯

স্কুল ও বসতবাড়ির কাছে কালীগঙ্গায় বালু উত্তোলনের অনুমতি, ঝুঁকিতে জনপদ

বাবুল আহমেদ, মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ২:৪৬
শেয়ার: mail
স্কুল ও বসতবাড়ির কাছে কালীগঙ্গায় বালু উত্তোলনের অনুমতি, ঝুঁকিতে জনপদ

কাল প্রকাশ। ছবি: সংগৃহীত

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কালীগঙ্গা নদীর ‘চামটা-পৌলী-বিলবড়িয়াল’ এলাকায় জনবসতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকার বিষয়টি সরকারি নথিতেই স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়েছে। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনে তীব্র নদীভাঙন, ঘরবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। অথচ সরকারি বিধিনিষেধ ও ঝুঁকির চিত্র থাকার পরও স্রেফ ‘রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে’ ওই এলাকাকে বালুমহাল হিসেবে ইজারা দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

দেশের প্রচলিত ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা (সংশোধিত) আইন, ২০২৩’-এর ৪(৪) ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকা বা জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকলে সেখানে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ। অথচ সরকারি নথিতে ঝুঁকির স্পষ্ট চিত্র উঠে আসার পরও আইনকে পাশ কাটিয়ে ইজারার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর (স্মারক নং-১৬৯৫) মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা ভূমি অফিস থেকে বালুমহালটির ইজারা প্রক্রিয়ার প্রাথমিক প্রস্তাব তৈরি করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সে সময় প্রাথমিক প্রস্তাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা জনবসতির অস্তিত্ব উল্লেখ করা হয়নি। তবে পরবর্তীতে ২৪ ডিসেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় থেকে পাঠানো মতামত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, প্রস্তাবিত বালুমহালের উভয় তীরসংলগ্ন এলাকায় আবাসিক জনবসতি রয়েছে। সেখানে একটি উচ্চ বিদ্যালয় ও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও বিদ্যমান। কিন্তু একই প্রতিবেদনে আইনের ধারা উল্লেখ করার পরেও শেষাংশে ‘সরকারের রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে’ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের জন্য ইজারা প্রদানের সুপারিশ করা হয়।

এ ছাড়া ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর (স্মারক নং-এন-এল-৫/২১১৬) মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আকতারুজ্জামান জেলা প্রশাসকের কাছে চূড়ান্ত কারিগরি মতামত দেন। ওই চিঠিতে সতর্ক করে বলা হয়, হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ অনুযায়ী নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে বালু উত্তোলন করা হলে কালীগঙ্গা নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হতে পারে এবং তীব্র ভাঙনে পার্শ্ববর্তী ঘরবাড়ি ও সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার চরম ঝুঁকি রয়েছে।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের তরা ব্রিজের উজান ও ভাটিতে এক কিলোমিটার দূরত্ব বজায় রেখে তিন মৌজা মিলিয়ে মোট ৩৮ দশমিক ৪৮ একর আয়তনের বালুমহালটি ইজারা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চামটা মৌজায় ৪ দশমিক ১৫ একর থেকে ৭ লাখ ৫২ হাজার ২৬৮ ঘনফুট, পৌলী মৌজায় ৩ দশমিক ৮ একর থেকে ৭ লাখ ৮০ হাজার ৪৬ ঘনফুট এবং বিলবড়িয়াল মৌজায় ৩১ দশমিক ২৫ একর থেকে সর্বোচ্চ ৫৯ লাখ ২৫ হাজার ৫৯২ ঘনফুট বালু উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনটি মৌজা থেকে সর্বমোট ৭৪ লাখ ৫৭ হাজার ৯০৭ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের সময় গভীরতা ও সীমানা তদারকিতে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি থাকে না। ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি ইকবাল হোসেন কচি বলেন, ‘সরকারি নথিতেই যখন নদীভাঙন এবং স্কুলসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে, তখন কীভাবে এমন এলাকায় ইজারা দেওয়া হলো তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। রাজস্ব আদায়ের চেয়ে মানুষের জানমাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রক্ষা করা প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব।’

নদী গবেষক ও রিভারাইন পিপলের পরিচালক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘ঝুঁকির কথা সরকারি নথিতে স্বীকার করার পরও ইজারা দেওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও জননিরাপত্তাকে উপেক্ষা করে কেবল রাজস্ব বিবেচনায় নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণের এই প্রক্রিয়াটি পুনর্বিবেচনা করা দরকার।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব মুহাম্মদ আলী জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তিনি কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না।

অন্যদিকে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বালুমহাল ইজারা দেওয়ার সুযোগ নেই। নথিপত্রে কোনো ব্যত্যয় ঘটে থাকলে বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সরেজমিনে পুনর্তদন্ত করে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হবে। জনস্বার্থ বিঘ্নিত হওয়ার প্রমাণ মিললে পরবর্তী বছর থেকে বালুমহালটি বাতিল করা হবে।’

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬ | Globe kalprakash.com

স্কুল ও বসতবাড়ির কাছে কালীগঙ্গায় বালু উত্তোলনের অনুমতি, ঝুঁকিতে জনপদ

বিস্তারিত কমেন্টে