চীন ও নেপাল সীমান্তের কাছে হিমালয়ের একটি হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। গত বুধবারের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৩ হাজারেরও বেশি মানুষ। এর মধ্যে শুধু নেপালের বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা থেকেই ৯ শতাধিক কর্মী নিখোঁজ রয়েছেন।
চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বতে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১৬ এবং এখনও ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। সেখানে জীবিতদের সন্ধানে ব্যাপক উদ্ধার তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
নেপালের স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সংস্থার (আইপিপিএ) রোববারের তথ্যমতে, ৯৩৩ জন শ্রমিকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তারা মূলত দেশটির সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলার ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সাইট ও টানেলে কর্মরত ছিলেন। নিখোঁজদের মধ্যে নেপাল, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীনের নাগরিকরাও রয়েছেন। চিলিমে হাইড্রো পাওয়ার কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক বাবুরাজ মাহারজান জানিয়েছেন, কাদামাটি ও ভারী ধ্বংসস্তূপে টানেলগুলোর মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভেতরে প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
নিখোঁজদের সন্ধানে নেপাল ও চীনের বাহিনীর সঙ্গে ভারতীয় উদ্ধারকারী দলও যোগ দিয়েছে। নেপালের পররাষ্ট্র সচিব অমৃত বাহাদুর রাই জানিয়েছেন, ১৯ হাজার নিরাপত্তাকর্মী ও ১৬টি হেলিকপ্টার উদ্ধারকাজে নিয়োজিত রয়েছে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া এবং নতুন করে পাহাড়ি ঢল নামায় অনুসন্ধান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে মৃতের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকায় মরদেহ সংরক্ষণ এবং ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নেপালের মর্গ ও হাসপাতালগুলোতে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সরকার নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে।
চীনের তিব্বত অঞ্চলেও এই বন্যার ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। তিব্বতের জিরং কাউন্টিতে ১৬ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে চীনা কর্তৃপক্ষ।
ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ি এলাকাগুলোতে সড়ক যোগাযোগ ও সেতু ধসে পড়ায় সামগ্রিক উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম কঠিন হয়ে পড়েছে। নেপালের অর্থমন্ত্রীর আশঙ্কা, এই দুর্যোগে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমন চরম মানবিক সংকটের মুখে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কয়েক মিলিয়ন ডলারের জরুরি ত্রাণ সহায়তা ঘোষণা করেছে।
দুর্যোগের ভয়াবহতার মধ্যেও কিছু নাটকীয়ভাবে বেঁচে ফেরার ঘটনা ঘটেছে। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া লোকালয়ে ফিরে স্বজন হারানোর শোক পালন করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দীর্ঘ উদ্ধার তৎপরতার পর নিখোঁজ এক কিশোরীকে জীবিত উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, দুপুরের খাবারের বিরতিতে ক্লাসের বাইরে থাকায় একটি স্কুলের বহু শিক্ষার্থী নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।
এদিকে ভূমিধসের কারণে একটি অস্থায়ী প্রাকৃতিক হ্রদ তৈরি হওয়ায় উদ্ধারকাজে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। নেপালের একটি নদী ধ্বংসাবশেষে আটকে গিয়ে পানির প্রবাহ বিপজ্জনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় পার্শ্ববর্তী এলাকায় নতুন করে বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
(সূত্র: আল-জাজিরা)
kalprakash.com/IM