রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬ | ১৪ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ১৬ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ | ভোর ৪:১১:২০

কুংফু থেকে কারখানা: চীনের হিউম্যানয়েড রোবটের সম্ভাবনা ও কঠিন বাস্তবতা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৬:৩৫
শেয়ার: mail
কুংফু থেকে কারখানা: চীনের হিউম্যানয়েড রোবটের সম্ভাবনা ও কঠিন বাস্তবতা

কাল প্রকাশ। ছবি: সংগৃহীত

কুংফু, নাচ কিংবা বক্সিংয়ের মতো জটিল শারীরিক কসরত দেখিয়ে বিশ্বজুড়ে হইচই ফেলে দিয়েছে চীনে তৈরি হিউম্যানয়েড রোবট। তবে কারখানায় মানুষের মতো নিখুঁত ও দক্ষতার সঙ্গে নিয়মিত কাজ করার ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে এসব রোবটের।

দক্ষিণ চীনের একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে সারি সারি করে রাখা হয়েছে শতাধিক হিউম্যানয়েড রোবট। সেখানে হেডসেট পরা একদল মানব প্রশিক্ষক রোবটগুলোকে বাক্স সাজানো, নুডলস প্যাকেট করা কিংবা কফি তৈরির মতো প্রাথমিক কাজগুলো শেখাচ্ছেন। তবে কেন্দ্রটিতে রোবটগুলোর কার্যক্রম এখনও বেশ ধীরগতির। একজন নতুন প্রশিক্ষককে একটি কার্যকর নড়াচড়া শেখাতে প্রায় ৩০০ বার চেষ্টা করতে হয়। অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের ক্ষেত্রেও সফল একটি মুভমেন্টের জন্য গড়ে ৫০টি প্রচেষ্টা প্রয়োজন হচ্ছে।

চীনের রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউবিটেক গত বছরের অক্টোবরে গুয়াংশি আঞ্চলিক সরকারের কাছ থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের চুক্তি পায়। এর আওতায় প্রতিষ্ঠানটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রটির জন্য হিউম্যানয়েড রোবট ও হার্ডওয়্যার সরবরাহ করেছে। কেন্দ্রটির মূল লক্ষ্য তথাকথিত ‘এমবডিড এআই’ (Embodied AI) বা এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য প্রশিক্ষণ-উপাত্ত তৈরি করা, যার মাধ্যমে রোবট বাস্তব জগতের পরিস্থিতি দেখে বুঝতে, সিদ্ধান্ত নিতে এবং শারীরিকভাবে কাজ করতে পারে। প্রশিক্ষকেরা হেডসেটের মাধ্যমে রোবটের দৃষ্টি দিয়ে চারপাশ দেখেন এবং হাতে থাকা সেন্সরযুক্ত কন্ট্রোলারের সাহায্যে নিজেদের শারীরিক নড়াচড়াকে রোবটের মুভমেন্টে রূপান্তর করেন।

শ্রমিকসংকট ও রোবটের প্রয়োজনীয়তা চীনের জন্য হিউম্যানয়েড রোবটের উন্নয়ন কেবল প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা নয়, বরং দেশটির অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দ্রুত বয়োবৃদ্ধ জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং তরুণ শ্রমিকের সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে শিল্প খাতের শ্রমিকসংকট মেটাতে রোবটের ওপর জোর দিচ্ছে বেইজিং। বার্তা সংস্থা রয়টার্স গত এপ্রিলে গুয়াংশির লিউঝৌ শহরের প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি পরিদর্শন করে। কেন্দ্রটির লক্ষ্য ভবিষ্যতে কারখানাগুলোর কাছে রোবট প্রশিক্ষণের উপাত্ত বিক্রি করা। তবে সংশ্লিষ্টরা স্বীকার করেছেন, অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয় এবং প্রশিক্ষণ-উপাত্তের কম মূল্যের কারণে সরকারি ভর্তুকিনির্ভর এ প্রকল্পের এখনও লাভজনক বাণিজ্যিক মডেল তৈরি হয়নি।

কুংফু বনাম কারখানার বাস্তবতা চীনের রোবট নির্মাতারা হার্ডওয়্যার তৈরিতে বিশ্বমানের সক্ষমতা অর্জন করলেও জটিল কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সাধারণ বুদ্ধিমত্তা এখনও তৈরি করতে পারেনি। মার্চে এক শিল্প সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোবোটিকস প্রতিষ্ঠান ইউয়ানলি লিংজির প্রধান নির্বাহী তাং ওয়েনবিন বলেন, রোবটের বুদ্ধিমত্তা বা ‘আইকিউ এখনও খুব কম’। অনেক ক্ষেত্রে যাকে রোবটের কর্মদক্ষতা বলা হচ্ছে, তা মূলত পূর্বনির্ধারিত কসরতের প্রদর্শনী মাত্র।

ব্যাংক অব আমেরিকা গ্লোবাল রিসার্চের তথ্যমতে, গত বছর বিশ্বজুড়ে সরবরাহ হওয়া প্রায় ২০ হাজার হিউম্যানয়েড রোবটের ৯৫ শতাংশই তৈরি করেছে চীনা নির্মাতারা। ২০৩০ সালের মধ্যে এই বৈশ্বিক সরবরাহ বছরে ১২ লাখে পৌঁছাতে পারে। চীনের এ আধিপত্যে শঙ্কিত হয়ে সাবেক ট্রাম্প প্রশাসন চীনা হিউম্যানয়েড রোবট আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

ভর্তুকি মডেল ও অর্থনৈতিক কার্যকারিতা চীন ইলেকট্রিক গাড়ি ও সৌর প্যানেলের মতোই সরকারি ভর্তুকি দিয়ে এ শিল্পকে দ্রুত সম্প্রসারণের নীতি অনুসরণ করছে। বর্তমানে দেশটিতে ১৫০টিরও বেশি হিউম্যানয়েড রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশটির বিভিন্ন পর্যায়ের সরকার অন্তত ২৩ কোটি ডলার ব্যয় করেছে রোবট ক্রয়ে। শেনঝেন শহর আগামী বছরের মধ্যে ১ হাজার ২০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান নিয়ে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের একটি শিল্পগুচ্ছ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, নির্দিষ্ট কাজের জন্য তৈরি সস্তা ও নির্ভরযোগ্য প্রচলিত ‘রোবোটিক বাহু’র তুলনায় মানুষের আকৃতির হিউম্যানয়েড রোবটের বাণিজ্যিক উপযোগিতা এখনও সীমিত। বেইজিংয়ে শাওমির বৈদ্যুতিক গাড়ি কারখানায় ৭০০টির বেশি শিল্প রোবট স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করছে, যেখানে হিউম্যানয়েড রোবটের ব্যবহার এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে।

বাস্তব প্রয়োগ ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য হিউম্যানয়েড রোবটের বাস্তব প্রয়োগ শুরু হয়েছে। বেইজিংয়ের ফার্মেসিগুলোতে ‘গ্যালবট’ নামের রোবট তাক থেকে ওষুধ বাছাই ও সরবরাহের কাজ করছে, যার সফলতার হার ৯৫ শতাংশের বেশি।

তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘ভিশন-ল্যাঙ্গুয়েজ-অ্যাকশন’ মডেল এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ-উপাত্তের ঘাটতিতে। শিল্প খাতের হিসাব অনুযায়ী, হিউম্যানয়েড রোবটের প্রকৃত শারীরিক বুদ্ধিমত্তা অর্জনের জন্য প্রয়োজন প্রায় ১০ কোটি ঘণ্টার প্রশিক্ষণ-উপাত্ত, যার বিপরীতে বর্তমানে মাত্র ৫ লাখ ঘণ্টার উপাত্ত রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কুংফু বা বক্সিংয়ের মঞ্চে চীনের হিউম্যানয়েড রোবট চমক দেখালেও, কারখানায় মানুষের বিকল্প হিসেবে স্থায়ী জায়গা করে নিতে এ প্রযুক্তিকে এখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬ | Globe kalprakash.com

কুংফু থেকে কারখানা: চীনের হিউম্যানয়েড রোবটের সম্ভাবনা ও কঠিন বাস্তবতা

বিস্তারিত কমেন্টে