ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। এতে মানুষের চলার পথে সব বিষয়ের সুষ্ঠু সমাধান রয়েছে। প্রিয় নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের ভালোবাসায় সব সময় বিভোর ছিলেন। তাই তো তিনি উম্মতের জন্য সব ধরনের সংক্রামক ব্যাধি থেকে বাঁচার দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন।
দেশে হঠাৎ হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। যদিও নিয়ম অনুযায়ী জন্মের ৯ মাসে প্রথম টিকা দেয়ার কথা, তবে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিশু ৯ মাসের কম বয়সি। এই পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা টিকা কার্যক্রমের বয়সসীমা কমিয়ে একমাসের বিশেষ ক্যাম্পেইন করার পরামর্শ দিয়েছেন।
দেশের ১০ জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ৩০ মার্চ পর্যন্ত সারাদেশে শনাক্ত হয়েছে ৭৬৪ জন এবং কিছু মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। সাধারণত হাম প্রতিরোধে জন্মের ৯ থেকে ১৫ মাসের মধ্যে শিশুদের টিকা দেয়া হয়। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, হাম আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের ৬০ শতাংশই নয় মাসের কম বয়সি।
হামসহ যাবতীয় সংক্রামক রোগ হলে সঠিক চিকিৎসার পাশাপাশি আমলও করা যায়। কারণ রোগ মানুষের জীবনের বাস্তবতা। তবে ইসলাম রোগকে শুধু কষ্ট নয়, বরং মহান আল্লাহর পরীক্ষা ও রহমতের দরজা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। তাই মুসলিমের কর্তব্য হলো রোগ এলে ধৈর্য ধারণ করা, চিকিৎসা গ্রহণ করা এবং সর্বোপরি মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করা।
বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) ও আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, নবীজি বলেন, যে ব্যক্তি কোনো রোগাক্রান্ত বা বিপদগ্রস্ত লোককে দেখে উল্লিখিত দোয়াটি পড়ে, সে ওই ব্যাধিতে কখনো আক্রান্ত হবে না। (তিরমিজি: ৩৪৩২)
দোয়াটি হলো:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي عَافَانِي مِمَّا ابْتَلاَكَ بِهِ وَفَضَّلَنِي عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقَ تَفْضِيلاً (উচ্চারণ: আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি আ-ফানি মিম্মাবতালাকা বিহি, ওয়া ফাদদলানি আলা কাছিরিম মিম্মান খলাকা তাফদিলা।)
অর্থ: সকল প্রশংসা আল্লাহর, তিনি তোমাকে যে ব্যাধিতে আক্রান্ত করেছেন, তা থেকে আমাকে নিরাপদ রেখেছেন এবং তার অসংখ্য সৃষ্টির ওপর আমাকে সম্মান দান করেছেন।
হজরত আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর রা. থেকে বর্ণিত, আমি আমার পিতাকে বললাম, আব্বাজান, আমি আপনাকে প্রতিদিন ভোরে ও সন্ধ্যায় তিনবার বলতে শুনি, হে আল্লাহ, আমার দেহ সুস্থ রাখুন। হে আল্লাহ, আমাকে সুস্থ রাখুন আমার শ্রবণ ইন্দ্রিয়ে। হে আল্লাহ, আমাকে সুস্থ রাখুন আমার দৃষ্টিশক্তিতে। আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নাই। তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ বাক্যগুলো দ্বারা দোয়া করতে শুনেছি। সে জন্য আমিও তার নিয়ম অনুসরণ করতে ভালোবাসি। (আবু দাউদ ৫০৯০)
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা পাঁচটি অবস্থায় পতিত হওয়ার পূর্বে পাঁচটি জিনিসকে মূল্য দাও। ১. বৃদ্ধ হওয়ার পূর্বে যৌবনকে, ২. রোগ আক্রমণের পূর্বে সুস্থতাকে, ৩. কর্মব্যস্ততার পূর্বে অবসর সময়কে, ৪, মৃত্যু আসার পূর্বে জীবনকে এবং ৫. দরিদ্রতার পূর্বে সচ্ছলতাকে। (আল মুসতাদরাক হাকিম ৭৯১৬)
اللَّهُمَّ عَافِنِي فِي بَدَنِي اللَّهُمَّ عَافِنِي فِي سَمْعِي اللَّهُمَّ عَافِنِي فِي بَصَرِي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ الْكُفْرِ وَالْفَقْرِ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ (উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আফিনি ফি বাদানি, আল্লাহুম্মা আফিনি ফি সাময়ি; আল্লাহুম্মা আফিনি ফি বাসারি। লা ইলাহা ইল্লা আনতা, আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল কুফরি ওয়াল ফাকরি। আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন আজাবিল ক্বাবারি, লা ইলাহা ইল্লা আনতা।)
অর্থ: হে আল্লাহ, আমার দেহ সুস্থ রাখুন। হে আল্লাহ, আমাকে সুস্থ রাখুন আমার শ্রবণ ইন্দ্রিয়ে। হে আল্লাহ, আমাকে সুস্থ রাখুন আমার দৃষ্টিশক্তিতে। আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।
আরও পড়ুন: তাহাজ্জুদ নামাজে হৃদয়ের প্রশান্তি
দুরারোগ্য ব্যধি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে নবিজি (সা.) দোয়া করতেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْبَرَصِ وَالْجُنُونِ وَالْجُذَامِ وَمِنْ سَيِّئِ الأَسْقَامِ (উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিনাল বারাসি ওয়াল জুনূনি ওয়াল জুযামি ওয়া মিন সাইয়্যিইল আসকাম।)
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি শ্বেত, পাগলামি, কুষ্ঠ এবং ঘৃণ্য রোগগুলো থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসায়ি)
হজরত আইয়ুব (আ.) ছিলেন সম্ভ্রান্ত ও সম্পদশালী ব্যক্তিদের একজন ছিলেন। ধনাঢ্য নবী আইয়ুব (আ.)-এর অনেক সন্তানসন্ততি ছিল। মহান আল্লাহ যুগে যুগে নবী ও রসুলদের পরীক্ষা করেন। তেমনই পরীক্ষা ছিল তার সন্তানসন্ততি, ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নেয়া। তিনি এক ধরনের শারীরিক রোগে আক্রান্ত হন।
এ রোগের সময় তার শরীরের ওপরে বিভিন্ন কীট-পতঙ্গ চলাফেরা করতো। রোগের কারণে তার শরীর থেকে মাংস খসে পড়ে এমনকি তাঁর শরীরে হাড় ও শিরা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তাঁর স্ত্রী তার শরীরের নিচে ছাই বিছিয়ে রাখতেন।
পুরো শরীর আক্রান্ত হওয়ার পর শুধু জিহ্বা ও হৃৎপিণ্ড অক্ষত ছিল। এর মাধ্যমে তিনি আল্লাহ তায়ালার জিকির করতেন। এমন কঠিন পরিস্থিতিও আল্লাহর প্রশংসা করতেন।
রোগ বাড়তে থাকলে তিনি মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকেন। তিনি আল্লাহর কাছে যে দোয়াটি করেছিলেন তাহলো–
أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ (উচ্চারণ: আন্নী মাচ্ছানিয়াজ্জুররু ওয়া আনতা আরহামুর রাহিমিন।)
অর্থ: হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দুঃখ-ক্লেশ (ব্যাধি) স্পর্শ করেছে, আর আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু। (সুরা আম্বিয়া: ৮৩)
আরও পড়ুন: মুসলিম বিয়েতে ‘কুফু’ অর্থ কী
এ দোয়া কবুল করে মহান আল্লাহ বলেন,
অতঃপর আমি তার (সেই) আহ্বানে সাড়া দিলাম এবং তার দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিলাম এবং তার পরিবরাবর্গ ফিরিয়ে দিলাম, আর তাদের সঙ্গে তাদের সমপরিমাণ আরও দিলাম আমার পক্ষ থেকে কৃপাবশত : আর এটা ইবাদতকারীদের জন্যে উপদেশস্বরূপ। (সুরা আম্বিয়া: ৮৪)
kalprakash.com/SS
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















