জ্বালানি তেলের সংকট ও কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক শর্তের কারণে জয়পুরহাটে মোটরসাইকেল বাজারে চরম স্থবিরতা নেমে এসেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজনীয় তেল না পাওয়ায় যেমন ভোগান্তিতে পড়েছেন চালকরা, তেমনি নতুন মোটরসাইকেল কেনায় আগ্রহ হারাচ্ছেন ক্রেতারা। এতে জেলার মোটরসাইকেল ব্যবসায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জয়পুরহাটের প্রায় ২০টি জ্বালানি পাম্পের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটিতে তেল সরবরাহ চলছে। অধিকাংশ পাম্প তেল সংকটের কারণে বন্ধ রয়েছে। যেসব পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে সকাল থেকেই মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অনেকেই তেল সংগ্রহ করতে পারছেন না।
এর সঙ্গে প্রশাসনের নতুন শর্ত—রেজিস্ট্রেশন কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও হেলমেট ছাড়া তেল না দেওয়ার নির্দেশ—পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিআরটিএ জয়পুরহাট সার্কেলের মোটরযান পরিদর্শক রাম কৃষ্ণ পোদ্দার জানান, জেলায় ৫০ হাজারের বেশি মোটরসাইকেল রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১৫ হাজারের রেজিস্ট্রেশন নেই। এছাড়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সও নেই। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতেও বিআরটিএতে নতুন আবেদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়েনি। গত ১০ দিনে মাত্র ২৯টি রেজিস্ট্রেশন আবেদন জমা পড়েছে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে মোটরসাইকেল বিক্রিতেও। জেলা শহরের বিভিন্ন শোরুম ঘুরে দেখা গেছে, ক্রেতাদের উপস্থিতি অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। যেখানে আগে সপ্তাহে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মোটরসাইকেল বিক্রি হতো, এখন তা এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। ঈদ মৌসুমেও আগের বছরের তুলনায় বিক্রি কম হয়েছে।
দি ফ্রেন্ডস মটরসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জানুয়ারিতে ৫০টি, ফেব্রুয়ারিতে ৪০টি এবং মার্চে ঈদের কারণে প্রায় ৭০টি মোটরসাইকেল বিক্রি হলেও ঈদের পর গত কয়েক দিনে একটি মোটরসাইকেলও বিক্রি হয়নি।
হোন্ডা শোরুম এ-ওয়ান ইমপেক্সের স্বত্বাধিকারী শ্যামল কুমার ঘোষ বলেন, “ঈদ মৌসুমে যেখানে শতাধিক মোটরসাইকেল বিক্রি হতো, এবার তা ৭০টিতে নেমে এসেছে। ঈদের পর গত সাত দিনে মাত্র তিনটি বিক্রি হয়েছে। ২ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাড় দিয়েও ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না।”
হাসান ট্রেডিংয়ের মালিক মেহেদী হাসান জানান, “আগে ঈদে ১৫০ থেকে ২০০টি মোটরসাইকেল বিক্রি হতো, এবার হয়েছে মাত্র ৪১টি। তেল সংকট ও কৃষিপণ্যের কম দামের কারণে ক্রেতাদের আগ্রহ কমে গেছে।”
একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন অন্যান্য শোরুম মালিকরাও। সুজুকি ডিলার রাসেল ট্রেডিংয়ের সেলস এক্সিকিউটিভ হামিম হোসেন বলেন, “মানুষ এখন মোটরসাইকেল দেখতে আসছেই না। অফার থাকলেও বিক্রি একেবারে কমে গেছে।”
জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে কৃষি খাতেও। খোলা বাজারে পেট্রোল না পাওয়ায় সেচযন্ত্র বিক্রি কমে গেছে। বেঙ্গল মেশিনারিজের স্বত্বাধিকারী দেলোয়ার হোসেন বলেন, “প্রতিদিন ৪-৫টি সেচ মেশিন বিক্রি হতো, এখন কোনো বিক্রি নেই।”
এদিকে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আল-মামুন মিয়া জানান, মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও হেলমেট ছাড়া কোনো পাম্পে তেল সরবরাহ করা হবে না। তদারকির জন্য ২০ জন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যারা প্রতিদিন ফিলিং স্টেশনগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন।
ব্যবসায়ীরা দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় জয়পুরহাটে মোটরসাইকেল ব্যবসায় দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
জয়পুরহাট প্রতিনিধি 
























