চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো ভোলা জেলার শহীদ পরিবারের স্বজনেরা ঘাতকদের দ্রুত বিচার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং পরিবারগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের জোর দাবি জানিয়েছেন। বিভিন্ন ট্রাইব্যুনাল ও আদালতে দায়ের করা মামলার তদন্ত চলছে বলা হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান বিচার ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সহায়তার জন্য প্রহর গুনছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার রসুলপুর ও নজরুল নগর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জুলাই শহীদ হাসনাইনের স্ত্রী মাইসা আক্তার রুমা বেগম স্বামী হত্যার দ্রুত বিচার এবং চার বছরের একমাত্র কন্যা সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে নিজের যোগ্যতানুযায়ী একটি চাকরির আকুল আবেদন জানিয়েছেন।
শহীদ হাসনাইনের স্ত্রী রুমা জানান, তাঁর স্বামী ঢাকার রায়েরবাজারে একটি ডিজিটাল ক্যাবল ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন এবং কোনো প্রকার রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সন্ধ্যায় মাত্র ১৮ মাস বয়সী শিশুকন্যা রাইসাকে কোলে নিয়ে আদর করে বাসা থেকে বের হন তিনি। দেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলতে বের হলে মোহাম্মদপুরের সাত মসজিদ রোডে স্বৈরাচারী শাসনের অতর্কিত গুলিতে নিহত হন হাসনাইন।
কান্নাজড়ানো কণ্ঠে রুমা বেগম বলেন, “স্বামীর সাথে আমার মাত্র দুই বছরের সংসার ছিল। বর্তমানে চার বছরের মেয়ে রাইসাকে নিয়ে বাবার বাড়ি ভোলার ইলিশা ইউনিয়নের চরকালফুরা গ্রামে আশ্রয় নিয়েছি। তখনকার সময়ে কিছু অনুদান পেলেও তা দিয়ে আজীবন সংসার চালানো অসম্ভব।” এসএসসি পাস করা রুমা আরও জানান, ছোট মেয়েটা এখনো প্রতিদিন বাবাকে খুঁজে কেঁদে আকুল হয়, কিন্তু সেই শূন্যতা তো আর পূরণ হবার নয়। মেয়েটির শিক্ষা ভাতা ও নিজের একটি ব্যবস্থা হলে অন্তত মেয়েকে নিয়ে বেঁচে থাকা যেত।
হাসনাইনের মা হাসিনা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, তিনি ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ করে সংসার চালাতেন। উপার্জনক্ষম বড় ছেলেকে হারিয়ে এখন ছোট ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে অন্যের বাসায় কাজ করে কোনোমতে জীবন রক্ষা করছেন তিনি। তিনি তাঁর সন্তান হত্যার সাথে জড়িতদের ফাঁসি এবং শহীদ পরিবারের জন্য যথাযথ রাষ্ট্রীয় সহায়তা দাবি করেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চরফ্যাশনে হাসনাইনের পৈতৃক ভিটা এখন প্রায় পরিত্যক্ত। কেবল হাঁস-মুরগি ও ছাগল পালনে তা ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি চরম অবহেলায় তাঁর কবরের ফলকে শহীদ হওয়ার স্থান হিসেবে ‘মোহাম্মদপুর সাত মসজিদ রোড’-এর পরিবর্তে ভুলবশত ‘যাত্রাবাড়ী’ লিখে রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে, একই উপজেলার রসুলপুর ভাসানচর এলাকার আরেক জুলাই শহীদ বাহাদুর হোসেন মনির (১৭)। ১৯ জুলাই রাজধানীর ভাটারা নতুন বাজারের বাঁশতলা এলাকায় অতর্কিত গুলির মুখে বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই শাহাদাত বরণ করেন তিনি।
মনিরের মামা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, মনিরের লাশ গ্রামে আনার পর তৎকালীন স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী চক্রের পক্ষ থেকে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করতে পদে পদে বাধা, হয়রানি ও মারাত্মক হুমকির মুখোমুখি হতে হয়েছিল পরিবারটিকে।
kalprakash.com/IM