বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার হিসেবে উত্তর সাগরপথ (Northern Sea Route-NSR) নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ভারত ও সিঙ্গাপুরসহ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ এই আর্কটিক নৌপথকে ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুট হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে বাস্তব তথ্য বলছে, রাজনৈতিক আগ্রহ যতটা বেশি, বাণিজ্যিক ব্যবহার এখনো ততটা বাড়েনি।
দক্ষিণ কোরিয়া আর্কটিক সামুদ্রিক অবকাঠামো উন্নয়নে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। দেশটি আগামী সেপ্টেম্বরে বুসান থেকে নেদারল্যান্ডসের রটারডাম পর্যন্ত একটি পরীক্ষামূলক কনটেইনার জাহাজ পরিচালনার পরিকল্পনা করছে। এই রুট সফল হলে সুয়েজ খাল হয়ে প্রায় ৪০ দিনের যাত্রা কমে ২০ দিনে নামতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে জাপান তাদের আর্কটিক কৌশল হালনাগাদ করছে, সিঙ্গাপুর নিয়োগ দিয়েছে বিশেষ আর্কটিক রাষ্ট্রদূত এবং ভারতও রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর সাগরপথে লজিস্টিকস সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক সংস্থা রোসআটম ইতোমধ্যে দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি করেছে।
কাগজে-কলমে উত্তর সাগরপথ এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার দূরত্ব কমিয়ে দেয়। তবে বাস্তবে এটি এখনো মৌসুমি, বরফনির্ভর এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিপূর্ণ একটি নৌপথ।
২০২৫ সালে এই রুট দিয়ে মাত্র ১০৩টি ট্রানজিট যাত্রায় প্রায় ৩ দশমিক ২ মিলিয়ন টন পণ্য পরিবহন হয়েছে। একই সময়ে নিরাপত্তা সংকট থাকা সত্ত্বেও সুয়েজ খাল দিয়ে ১২ হাজারের বেশি জাহাজ চলাচল করেছে।
রাশিয়াও উত্তর সাগরপথে পণ্য পরিবহনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। ২০২৫ সালে মোট পরিবহন হয়েছে প্রায় ৩৭ মিলিয়ন টন, যার বেশিরভাগই ছিল রাশিয়ার তেল ও গ্যাস পরিবহন।
বিশ্বের শীর্ষ শিপিং প্রতিষ্ঠান মার্স্ক, সিএমএ সিজিএম এবং হাপাগ-লয়েড নিষেধাজ্ঞা, উচ্চ বীমা ব্যয় এবং পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে কার্যত এই রুট থেকে সরে গেছে। এমনকি চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত কসকো শিপিংও ২০২২ সালের পর উত্তর সাগরপথ ব্যবহার করেনি।
বর্তমানে তুলনামূলক ছোট দুটি চীনা কোম্পানি—সিলেজেন্ড শিপিং ও নিউ নিউ শিপিং লাইন—এই রুটে সীমিত পরিসরে কনটেইনার পরিবহন করছে।
রাশিয়ার এলএনজি প্রকল্পে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগকারী জাপানের বৃহৎ শিপিং কোম্পানি মিৎসুই ও.এস.কে. লাইনস (MOL) যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবুও দেশটি গবেষণা, আইসব্রেকার নির্মাণ এবং আর্কটিক নীতিতে বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্কটিক নৌপরিবহনের ভবিষ্যৎ শুধু বরফ গলার ওপর নির্ভর করছে না; বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতি, নিষেধাজ্ঞা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিনিয়োগই নির্ধারণ করবে এই রুটের সম্ভাবনা।
আগামী সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়ার পরীক্ষামূলক কনটেইনার যাত্রা সফল হলে উত্তর সাগরপথের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
অনলাইন ডেস্ক 























