দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল কাস্টমস হাউসে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে আদায় হয়েছে ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায় কমেছে প্রায় ৪৭০ কোটি টাকা।
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ হাজার ৭০৫ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৭ হাজার ২১ কোটি ৫১ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রাথমিকভাবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৮ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। পরে তা সংশোধন করে ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু অর্থবছর শেষে আদায় হয় ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৫৮ শতাংশ।
একই সময়ে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ১৪ লাখ ২ হাজার ১৪৪ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় আমদানির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার মেট্রিক টন কমেছে।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষের দাবি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীরগতি, আমদানি কমে যাওয়া এবং শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে। তাদের ভাষ্য, নিরাপদ ও স্বচ্ছ বাণিজ্য নিশ্চিত করতে কাস্টমস সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
তবে বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, মিথ্যা পণ্য ঘোষণা, ডিজিটাল ওজনযন্ত্রে কারসাজি, উচ্চ শুল্কের পণ্য কম শুল্কে খালাস, শেড থেকে পণ্য আত্মসাৎ এবং ভুয়া এন্ট্রি পাস ব্যবহারের মাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার কারণে সরকারের বিপুল রাজস্ব হারাতে হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এত বড় রাজস্ব ঘাটতি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র পণ্যের ভুল শ্রেণিবিন্যাস, মিথ্যা ঘোষণা ও ওজনযন্ত্রে কারসাজির মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গত এক মাসে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা প্রায় ১৫ কোটি টাকার বিভিন্ন পণ্যের চালান জব্দ করেছে কাস্টমস।
সাম্প্রতিক সময়ে একই ভারতীয় খালি ট্রাকের জন্য দুই ধরনের ওজন রেকর্ড, বেকিং পাউডারের ঘোষণার আড়ালে কোটি টাকার শাড়ি ও থ্রি-পিস, ইরেজার ও পেনসিলের ঘোষণার আড়ালে উচ্চ শুল্কের পণ্য আমদানির চেষ্টা এবং কেমিক্যাল জোন থেকে পণ্য সরিয়ে নেওয়ার মতো কয়েকটি ঘটনা আলোচনায় এসেছে। এসব ঘটনায় কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষ পৃথক তদন্ত শুরু করেছে।
এসব ঘটনার পর শুল্ক ফাঁকি, পণ্য পাচার ও সরকারি মালামাল আত্মসাতের অভিযোগে কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষ পৃথক চারটি মামলা করেছে। মামলাগুলোতে কাস্টমস কর্মকর্তা, বন্দর কর্মকর্তা, আনসার সদস্য, নিরাপত্তাকর্মী ও ট্রাকচালকসহ মোট ৫৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। কয়েকজন কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
এদিকে বিজিবির এক অভিযানে সরকারি নিলামের পণ্য কাস্টমসের নিজস্ব গুদাম থেকে পাচারের সময় কাস্টমসের এক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার অন্য আসামিদের এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি কাস্টমসের একটি দাপ্তরিক চিঠিতে বন্দরের একটি ডিজিটাল ওজনযন্ত্রে একই ভারতীয় খালি ট্রাকের জন্য একই সময়ে দুই ধরনের ওজন দেখানোর তথ্য উঠে আসে। বিষয়টি নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট চালান জব্দ করে তদন্ত শুরু করেছে কাস্টমস।
এ ছাড়া অনিয়মের অভিযোগে কয়েকটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—হুদা ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স লিংক ইন্টারন্যাশনাল, করিম অ্যান্ড সন্স, এমি এন্টারপ্রাইজ এবং মেসার্স আলতাফ অ্যান্ড সন্স। আরও কয়েকজন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
বেনাপোল ল্যান্ডপোর্ট ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, বন্দরের শেডের ভেতরে পণ্য আত্মসাৎ বা শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ঘটলে দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টদের ভূমিকাও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ হবে না। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়বে এবং স্বচ্ছ বাণিজ্য পরিবেশ নিশ্চিত হবে।
বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামীম হোসেন বলেন, কাস্টমসের অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওজনযন্ত্রের তথ্য, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং অভিযুক্তদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অনিয়মের প্রমাণ মিললে তিনি বন্দর, কাস্টমস বা ব্যবসায়ী—যেই হোন না কেন, তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার মো. ফাইজুর রহমান বলেন, “রাজস্ব ফাঁকি রোধে কাস্টমস সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। ওজনযন্ত্রে কারসাজি, মিথ্যা ঘোষণা কিংবা শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ মিললে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
মনির হোসেন, বেনাপোল প্রতিনিধি 






















