রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬ | ৭ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ৯ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ | সকাল ৯:১১:২৩

বনদস্যুর আতঙ্ক ও জলবায়ুর প্রভাবে মধু উৎপাদন ৪৫ শতাংশ কমেছে

কাল প্রকাশ
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬, ৭:৫৬
শেয়ার: mail
বনদস্যুর আতঙ্ক ও জলবায়ুর প্রভাবে মধু উৎপাদন ৪৫ শতাংশ কমেছে

কাল প্রকাশ। ছবি: সংগৃহীত

চলতি মৌসুমে সুন্দরবন থেকে মধু সংগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দুই মাসে সুন্দরবন থেকে মাত্র ১ হাজার ৭৩৮ কুইন্টাল মধু আহরণ করা হয়েছে। গত ছয় বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন উৎপাদন। আগের বছরের তুলনায় মধু সংগ্রহ কমেছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। বনদস্যুদের তৎপরতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবকে এ পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বন বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের একই সময়ে সুন্দরবন থেকে ২ হাজার ৭৬ কুইন্টাল মধু সংগ্রহ হয়েছিল। সেই তুলনায় চলতি বছর উৎপাদন কমেছে ৩৩৮ কুইন্টাল। সাতক্ষীরা, খুলনা, চাঁদপাই ও শরণখোলা—চারটি বন রেঞ্জেই উৎপাদন কমেছে। উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় সরকারের রাজস্ব আয়ও কমে দাঁড়িয়েছে ৩৯ লাখ ৩১ হাজার ২৭০ টাকায়। এতে একদিকে যেমন সরকারি রাজস্ব কমেছে, অন্যদিকে বননির্ভর হাজারো মৌয়াল পরিবারের আয়ও সংকুচিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মধু আহরণ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো মৌয়ালের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়া। ২০২৪ সালে যেখানে প্রায় ৮ হাজার মৌয়াল সুন্দরবনে প্রবেশ করেছিলেন, সেখানে চলতি বছর অনুমতি নিয়েছেন মাত্র ৩ হাজার ৪৭৯ জন। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এ সংখ্যা অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে।

মৌয়ালদের দাবি, বর্তমানে বাঘের চেয়ে বনদস্যুদের ভয়ই বেশি। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক অভিজ্ঞ মৌয়াল এবার বনের গভীরে যেতে আগ্রহ দেখাননি। ফলে সামগ্রিক মধু উৎপাদনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শরণখোলা ও খুলনা রেঞ্জে একজন মৌয়ালের গড় মধু সংগ্রহের পরিমাণ প্রায় আগের মতো থাকলেও মৌয়ালের সংখ্যা কমে যাওয়ায় মোট উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

এর প্রভাব বাজারেও পড়েছে। খলিশা ও গরান ফুলের মধুর দাম গত বছরের তুলনায় প্রতি মণে প্রায় ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবও উৎপাদন কমার একটি বড় কারণ। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় গাছে ফুল কম ফুটছে। পাশাপাশি আবহাওয়ার অস্বাভাবিকতার কারণে ফুল দ্রুত ঝরে পড়ায় মৌমাছি পর্যাপ্ত মধু সংগ্রহ করতে পারছে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, মৌয়ালের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এবার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও অর্জন সম্ভব হয়নি। পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, বনদস্যু দমনে র‍্যাব, কোস্টগার্ড ও পুলিশের সমন্বয়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।

তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি।

উল্লেখ্য, ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি পাওয়ার পর সুন্দরবনের মধুর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু উৎপাদনের এই ধারাবাহিক নিম্নগতি সেই সম্ভাবনাকে অনেকটাই ক্ষুণ্ন করছে। সুন্দরবন ও উপকূল সংরক্ষণ আন্দোলনের নেতারা বলছেন, বনদস্যু দমন এবং পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে সুন্দরবনের ঐতিহ্যবাহী মৌয়াল পেশা বড় সংকটে পড়বে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বননির্ভর মানুষের জীবিকা এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য। তাই নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, বনজীবীদের সুরক্ষা নিশ্চিত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬ | Globe kalprakash.com

বনদস্যুর আতঙ্ক ও জলবায়ুর প্রভাবে মধু উৎপাদন ৪৫ শতাংশ কমেছে

বিস্তারিত কমেন্টে