পশুপাখির প্রতি দয়া, অনুগ্রহ প্রদর্শন ও যত্নশীল হওয়ার জোরালো শিক্ষা দিয়েছেন মানবতার মুক্তির দূত মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। নির্বাক প্রাণীদের কষ্ট দেওয়ার ব্যাপারে তিনি কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। নবীজি (সা.)-এর জীবনের বিভিন্ন ঘটনা থেকে পশুপাখির প্রতি মানবিক ও সদয় আচরণের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। নিচে এমন সাতটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা তুলে ধরা হলো—
১. পশুর যথাযথ যত্ন নেওয়া একবার মহানবী (সা.) একটি অত্যন্ত দুর্বল ও ক্ষুধার্ত উট দেখতে পান। তখন তিনি বলেন, ‘এসব নির্বাক প্রাণীর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। এদের উপযুক্ত দানাপানি দিয়ে সুস্থ-সবল রাখো, সুস্থ পশুর পিঠে আরোহণ করো এবং খাওয়ার সময়ও সুস্থ-সবল প্রাণীর মাংস খাও।’ (সুনানে আবু দাউদ)
২. পশুকে আঘাত করা বা মুখে দাগ দেওয়া নিষেধ মহানবী (সা.) একবার এমন একটি পশুর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যার মুখে দাগ দেওয়া হয়েছিল এবং নাক দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছিল। দৃশ্যটি দেখে তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি এমন কাজ করে, আল্লাহ তাকে অভিশাপ দেন। কারও মুখে দাগ দেওয়া বা মুখে আঘাত করা উচিত নয়।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ)
৩. অতিরিক্ত বোঝা না চাপানো ও ক্ষুধার্ত না রাখা হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন আল্লাহর রাসুল (সা.) আমাকে তাঁর বাহনের পেছনে বসালেন এবং গোপনে একটি কথা বললেন, যা কাউকে বলতে নিষেধ করেছিলেন। এরপর তিনি আনসারদের একজনের বাগানে প্রবেশ করলেন। সেখানে একটি উট নবীজি (সা.)-কে দেখে আকুল হয়ে ডাকতে লাগল এবং তার চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগল। নবীজি (সা.) উটটির কাছে গিয়ে স্নেহের সঙ্গে তার মাথার ওপর হাত বুলিয়ে দিলেন, এতে উটটি শান্ত হলো। এরপর তিনি উটের মালিক সম্পর্কে জানতে চাইলে আনসারদের এক যুবক এসে বললেন, ‘এটি আমার, হে আল্লাহর রাসুল।’ তখন নবীজি (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ তোমার অধীনে যে প্রাণীটি দিয়েছেন, তার ব্যাপারে কি তুমি আল্লাহকে ভয় করো না? এই প্রাণীটি আমার কাছে অভিযোগ করেছে যে, তুমি তাকে ক্ষুধার্ত রাখো এবং তার ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দাও, ফলে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।’ (সুনানে আবু দাউদ)
৪. পশুর প্রতি সদয় আচরণের পুরস্কার মহানবী (সা.) বলেন, ‘এক ব্যভিচারী নারীকে আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। সে একটি কূপের পাশে তৃষ্ণায় মৃতপ্রায় একটি কুকুরকে হাঁপাতে দেখেছিল। তখন সে নিজের জুতা খুলে মাথার কাপড়ের সঙ্গে বেঁধে কূপ থেকে পানি তুলে কুকুরটিকে পান করায়। এই কাজের কারণে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহ বুখারি)
৫. মা পাখির কাছে ছানা ফিরিয়ে দেওয়া এক সাহাবি বর্ণনা করেন, এক সফরে আমরা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি কিছু সময়ের জন্য দূরে গেলে আমরা দুটি ছানাসহ একটি লাল পাখি দেখতে পাই এবং ছানাগুলো ধরে নিই। তখন মা পাখিটি এসে ব্যাকুল হয়ে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে মাটিতে আছড়ে পড়তে লাগল। এরই মধ্যে নবীজি (সা.) ফিরে এসে বললেন, ‘কে এই পাখিটিকে তার ছানাদের কারণে কষ্ট দিয়েছে? ছানাগুলো অবিলম্বে তার কাছে ফিরিয়ে দাও।’ এ ছাড়া তিনি একটি পিঁপড়ার ঢিবি আগুনে পোড়ানো দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে এটি আগুন দিয়ে পুড়িয়েছে?’ সাহাবিরা নিজেদের কথা জানালে তিনি বললেন, ‘আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকার একমাত্র আগুনের রবেরই রয়েছে।’ (সুনানে আবু দাউদ)
৬. খেলার ছলে পশুকে লক্ষ্যবস্তু বানানো নিষিদ্ধ মহানবী (সা.) বলেন, ‘জোরপূর্বক দখল করা সম্পদ বৈধ নয়। দাঁতওয়ালা হিংস্র প্রাণীর মাংসও বৈধ নয়। আর কোনো প্রাণীকে লক্ষ্যবস্তু বানানোও বৈধ নয়।’ (সুনানে নাসাঈ)। অন্য এক বর্ণনায় প্রাণ আছে এমন কোনো কিছুকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ব্যবহার করতে তিনি নিষেধ করেছেন।
৭. পশু জবাইয়ের সময় কষ্ট লাঘব করা মহানবী (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর ক্ষেত্রে ইহসান বা উত্তম আচরণ নির্ধারণ করেছেন। তাই যখন তোমরা হত্যা করবে, উত্তম পদ্ধতিতে হত্যা করবে। আর যখন জবাই করবে, উত্তম পদ্ধতিতে জবাই করবে। তোমাদের প্রত্যেকে যেন তার ছুরি ধারালো করে নেয় এবং পশুটিকে কষ্ট থেকে স্বস্তি দেয়।’ (সহিহ মুসলিম)
kalprakash.com/IM