প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সফর ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই উঠে এসেছে একটি প্রশ্ন: তিনি আদৌ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন কি না।
তবে এ বিষয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিশেষ করে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে নিরাপত্তাজনিত কারণে তাঁর পক্ষে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে ডিগ্রি সম্পন্ন না করেই তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়তে হয়। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক নেতার যোগ্যতা কি শুধুই প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির ওপর নির্ভর করে?
বাংলাদেশসহ বিশ্বের ইতিহাস বলছে, রাষ্ট্র পরিচালনায় সফল অনেক নেতার উচ্চশিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি ছিল না। তবুও তাঁরা নেতৃত্ব, সততা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে ইতিহাসে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ এক সমাবর্তনে রসিকতা করে বলেছিলেন, ভালো ফল না থাকায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেননি, কিন্তু পরে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হিসেবে সমাবর্তনে যোগ দিয়েছেন। তাঁর কথার আড়ালে ছিল অপূর্ণতার আক্ষেপ, তবে সেটি তাঁর রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীও মাধ্যমিকের পর আর পড়াশোনা এগিয়ে নিতে পারেননি। তবুও তাঁর সততা, সাধারণ জীবনযাপন এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। একইভাবে আধুনিক চীনের রূপকার মাও সে তুংও ছিলেন মূলত স্বশিক্ষিত। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও উল্লেখযোগ্য উচ্চশিক্ষা ছাড়াই দীর্ঘ সময় রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন।
বাস্তবে রাজনীতি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিষয় নয়। এটি মানুষের সঙ্গে সংযোগ, সংকট মোকাবিলা, নৈতিকতা ও নেতৃত্বের সমন্বয়। একজন রাজনীতিকের বড় শিক্ষা আসে জনগণের কাছ থেকে। জনগণই তাঁর শিক্ষক, আর বাস্তব জীবনই তাঁর পাঠশালা।
অন্যদিকে উচ্চশিক্ষিত আমলাতন্ত্র সবসময় জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে—এমনও নয়। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক কাঠামোতে জবাবদিহির সংকট রয়েছে। বিশেষ করে সামরিক শাসন ও দীর্ঘ স্বৈরশাসনের সময় আমলাতন্ত্র আরও শক্তিশালী ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠে।
এখানে প্রশ্ন ওঠে—প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কি সত্যিই নেতৃত্বের একমাত্র মানদণ্ড? একজন রাষ্ট্রনায়কের জন্য জ্ঞানের গভীরতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাহস, দূরদর্শিতা ও দেশপ্রেম কি আরও গুরুত্বপূর্ণ নয়?
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান অবস্থাও এ বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। দলীয় প্রভাব, ছাত্ররাজনীতির সংঘাত, শিক্ষক নিয়োগে আনুগত্যের সংস্কৃতি এবং গবেষণার দুর্বলতা দেশের উচ্চশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মান থেকে পিছিয়ে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিং সংস্থা ‘এডুর্যাঙ্ক’-এর ২০২৬ সালের তালিকায় বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের সেরাদের কাতারে জায়গা করে নিতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৮২৮তম, বুয়েট ১২০৯তম। গবেষণা, উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষায় পিছিয়ে পড়াই এর বড় কারণ।
এ প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, শুধু পুঁথিগত শিক্ষা নয়, গবেষণা ও উদ্ভাবনে জোর না দিলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। শিক্ষক নিয়োগে দলীয় বিবেচনার বদলে মেধাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
তাঁর এ উপলব্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে বাস্তব পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা এবং শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত সবার আত্মসমালোচনা।
কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনায় সবচেয়ে বড় বিষয় ডিগ্রি নয়—যোগ্য নেতৃত্ব, দায়বদ্ধতা ও জনগণের আস্থা।
kalprakash.com/SAS
অনলাইন ডেস্ক 





















