জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব সীমিত রাখতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্বজুড়ে কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ১৮ শতাংশ এবং ২০৪৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ কমাতে পারলে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) বার্ষিক এমিশন গ্যাপ প্রতিবেদনে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদনটি নিয়ে দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বনেতাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব পদক্ষেপের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাক্-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য অর্জন এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে তাপমাত্রা এই সীমা অতিক্রম করার মাত্রা ও সময়কাল যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার সুযোগ এখনো রয়েছে।
গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে নিঃসরণ ১৮ শতাংশ এবং ২০৪৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ কমানো সম্ভব হলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এতে তীব্র দাবদাহসহ জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন বিপর্যয়কর প্রভাব পুরোপুরি ঠেকানো না গেলেও পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।
ইউএনইপির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ আগের বছরের কাছাকাছি পর্যায়ে ছিল। তবে একে নিঃসরণের সর্বোচ্চ পর্যায় বলে নিশ্চিত করতে রাজি নন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত বিস্তার সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা এখনো অনেক বেশি।
ইউএনইপির নির্বাহী পরিচালক ইনগার অ্যান্ডারসেন বলেছেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সরকারগুলোকে বছরের পর বছর সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়ায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে।
তবে তিনি এ লক্ষ্য পুরোপুরি পরিত্যাগ না করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলেও সেই পরিস্থিতি কত দিন স্থায়ী হবে, তা কমিয়ে আনার জন্য এখনই উদ্যোগ নিতে হবে।
জলবায়ু সংকট মোকাবিলার প্রচেষ্টা রাজনৈতিক অবস্থান ও নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আবারও প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে বৈশ্বিক নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জলবায়ুবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট অ্যানালিটিক্সের প্রধান নির্বাহী বিল হেয়ার বলেন, বড় নিঃসরণকারী দেশগুলোর উচিত রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া।
এদিকে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত কপ৩০ জলবায়ু সম্মেলনে দেশগুলোর দেওয়া নতুন প্রতিশ্রুতিগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলেও বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে বলে ইউএনইপির মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। আর বর্তমান জলবায়ুনীতি অব্যাহত থাকলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিমাণ ২.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, তাপমাত্রা এভাবে বাড়তে থাকলে দাবদাহ, দাবানল এবং জলবায়ু ব্যবস্থার গুরুতর পরিবর্তনের ঝুঁকি আরও বাড়বে।
আফ্রিকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার শিফট আফ্রিকার পরিচালক মোহাম্মদ অ্যাডো বলেছেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলার প্রযুক্তি ও সমাধান হাতের নাগালেই রয়েছে। সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের বিস্তার দ্রুত বাড়লেও সরকারগুলো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে প্রয়োজনীয় গতি দেখাতে পারছে না।
পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের পরিচালক ও জলবায়ুবিজ্ঞানী ইয়োহান রকস্ট্রমও দ্রুত পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, দেশগুলোর বর্তমান প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলেও ২০৩৫ সালে বার্ষিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ প্রায় ৫০ গিগাটনে পৌঁছাতে পারে। অথচ তা ৩৫ গিগাটনের নিচে নামানো প্রয়োজন।
কার্বন ডাই-অক্সাইডের পাশাপাশি মিথেন নিঃসরণ কমানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি। মিথেন একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস, যা স্বল্পমেয়াদে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। এর নিঃসরণ দ্রুত কমানো গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের গতি নিয়ন্ত্রণে তা তুলনামূলক দ্রুত ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং মিথেন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি গ্রহণ এখন অত্যন্ত জরুরি। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি সরকারগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দ্রুত বাস্তবায়নই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
kalprakash.com/IM