পাকিস্তানে রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রয়োগ বাড়ছে। দেশটির সাবেক এক প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রীকে সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ত্রাসবাদের মামলায় আসামি করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে এই আইনে অভিযুক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের তালিকা আরও দীর্ঘ হলো।
১৯৯৭ সালে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী আইন কার্যকর হয়। সে সময় দেশটির জনবহুল দুটি প্রদেশে সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত সহিংসতা চলছিল। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে প্রচলিত বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি বিশেষ আদালত গঠনের সুযোগ দেয় এই আইন।
পরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযান শুরুর পর দেশটির সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে জঙ্গিরা পুনর্গঠিত হতে থাকে। ২০০৭ সালে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। এরপর পাকিস্তানে একের পর এক প্রাণঘাতী হামলা চালায় তারা।
জঙ্গিদের বিচারের জন্য প্রণীত আইনটি পরে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হতে থাকে। ১৯৯৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল পারভেজ মোশাররফ এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের ভাই নওয়াজ শরিফও ২০০০ সালে এই আইনের আওতায় মামলার মুখে পড়েছিলেন।
পাকিস্তানে পুলিশি কার্যক্রম নিয়ে গবেষণাকারী জোহা ওয়াসিমের মতে, সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা অত্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় আইনটির অপপ্রয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কয়েক দশকে একাধিক সংশোধনীর মাধ্যমে এই আইনের আওতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। ফলে মুক্তিপণের জন্য অপহরণ, ছিনতাই, অর্থ পাচার কিংবা নিষিদ্ধ সংগঠনকে সহায়তা করার মতো অভিযোগও সন্ত্রাসবাদের মামলার আওতায় আসতে পারে।
খাইবার পাখতুনখাওয়ার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির বিরুদ্ধে করা মামলাটির সূত্রপাত ২০২৩ সালে। সে সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর সমর্থকেরা একটি রাষ্ট্রীয় বেতারকেন্দ্রে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। ওই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মামলায় আফ্রিদিকে আসামি করা হয়েছে। বর্তমানে প্রদেশটিতে জরুরি শাসন চলছে।
ইমরান খান নিজেও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে মামলার মুখে রয়েছেন। একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে নিষিদ্ধ একটি কট্টরপন্থী ইসলামপন্থী দলের নেতাদের বিরুদ্ধেও। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাশ্মীরি, পশতুন ও বেলুচ অধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধেও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয়েছে।
আইনটির এমন বিস্তৃত প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন সাবেক রাজনীতিক শিরিন মাজারি। তাঁর মেয়ে আইনজীবী ইমান মাজারি ও জামাতা হাদি আলী চট্টা বর্তমানে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে বিচারের মুখোমুখি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের দেওয়া পোস্টসংক্রান্ত একটি মামলার পর এখন তাঁদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস ছড়ানোর অভিযোগসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। জানুয়ারি থেকে তাঁরা কারাগারে রয়েছেন।
নিজেও কারাবন্দি হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে শিরিন মাজারির। কিন্তু এবার নিজের মেয়ে ও জামাতার পরিস্থিতিতে তিনি অসহায় বোধ করছেন। তাঁর ভাষায়, কিছুই করার নেই।
পাকিস্তানে সন্ত্রাস দমনের জন্য বিশেষ আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন কম। কিন্তু সেই আইনের সংজ্ঞা যখন বিস্তৃত হয়ে রাজনৈতিক বিরোধী ও অধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে, তখন ন্যায়বিচার নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়।
সন্ত্রাসবাদের প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি আইনের অপপ্রয়োগ ঠেকানোও জরুরি। অন্যথায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রণীত আইনই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।
kalprakash.com/IM