পাকিস্তানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সমান অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দীর্ঘদিনের। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণে দেশটির ব্যর্থতা এখনো স্পষ্ট। গত সপ্তাহে প্রকাশিত মানবাধিকার কমিশন অব পাকিস্তানের (এইচআরসিপি) নতুন প্রতিবেদনে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার পরিস্থিতির এই চিত্র উঠে এসেছে। স্যাংচুয়ারি ডিনায়েড: ফ্রিডম অব রিলিজিয়ন অর বিলিফ ইন ২০২৫/২৬ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা থামেনি।
এটি এ বিষয়ে এইচআরসিপির সপ্তম বার্ষিক প্রতিবেদন। এতে ২০২৫ সালের জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন আইন এবং বেলুচিস্তান ও পাঞ্জাবে বাল্যবিবাহ রোধে আইন পাসের উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হয়েছে।
তবে জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন আইন পাস হওয়ার কয়েক মাস পরও তা কার্যকর হয়নি। এদিকে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধর্ম অবমাননার আইন সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যও ক্রমে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হচ্ছে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মেয়েরা অপহরণ ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরের শিকার হচ্ছে। এ ছাড়া তাদের বিয়ে করতেও বাধ্য করা হচ্ছে। সরকারি চাকরিতে সংখ্যালঘুদের জন্য ৫ শতাংশ কোটা থাকলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ কমছে। মূলধারার গণমাধ্যমেও তাদের সমস্যাগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।
সংখ্যালঘুদের অধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে দারিদ্র্য, লিঙ্গবৈষম্য এবং নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার মতো সমস্যার যোগসূত্র রয়েছে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মেয়েদের অপহরণ ও জোর করে ধর্মান্তরের ঘটনা প্রমাণ করে, রাষ্ট্র তাদের পাশাপাশি নারী ও শিশুদের সুরক্ষা দিতেও ব্যর্থ হচ্ছে। একইভাবে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নিয়োগে বৈষম্য তাদের দারিদ্র্যের চক্রে আটকে রাখছে। পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়াই তাদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে হচ্ছে।
এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তাও উদ্বেগজনক। কোনো সংখ্যালঘু উপাসনালয়ে হামলা চালিয়ে জনতা তা ধ্বংস করলেও পুলিশ অনেক সময় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। সংখ্যালঘু কোনো মেয়ে অপহৃত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতেও ব্যর্থ হয় তারা। ফলে আইন ও নীতি প্রণয়নের উদ্যোগ থাকলেও সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় আইন পাস করা জরুরি। কিন্তু সেই আইন বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাই যদি তাঁদের সুরক্ষায় আন্তরিক না হন, তাহলে আইন প্রণয়নের সুফল পাওয়া কঠিন। জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন আইন কার্যকর না হওয়া এবং বাল্যবিবাহ রোধে গৃহীত উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা তারই উদাহরণ। একই সঙ্গে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও বৈষম্যকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলার প্রবণতাও মোকাবিলা করতে হবে।
এইচআরসিপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ যেকোনো মাধ্যমে সহিংসতায় উসকানির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং ধর্মীয় স্বাধীনতাসংক্রান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের সুপারিশ করেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। তবে সমস্যাটি শুধু আইনের অভাব নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের সামাজিক মনোভাব, বিদ্বেষ ও বৈষম্য।
এসবের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সংখ্যালঘুদের সমান অধিকার কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আইন পরিবর্তন করতেই যদি এত সময় লাগে, তবে মানুষের মন থেকে ঘৃণা ও বৈষম্য দূর করতে আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে?
kalprakash.com/IM