আল্লাহ তাআলার অন্যতম নিয়ামত হলো প্রাচীনকাল ও বর্তমান যুগের বিভিন্ন যানবাহন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তিনি (আল্লাহ) তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন। তাতে তোমাদের জন্য রয়েছে উষ্ণতার উপকরণ, নানা উপকার এবং তা থেকে তোমরা আহার কর। আর যখন তোমরা সকালে সেগুলোকে চারণভূমিতে নিয়ে যাও এবং সন্ধ্যায় ফিরিয়ে আনো, তখন তাতে তোমাদের জন্য সৌন্দর্য রয়েছে। আর এগুলো তোমাদের ভার বহন করে এমন শহরে নিয়ে যায়, যেখানে তোমরা প্রাণান্তকর কষ্ট ছাড়া পৌঁছাতে পারতে না। নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক অতি দয়ালু, পরম করুণাময়। আর তিনি ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা এগুলোতে আরোহণ করতে পারো এবং এগুলো তোমাদের জন্য সৌন্দর্যেরও উপকরণ। আর তিনি এমন কিছু সৃষ্টি করেন, যা তোমরা জানো না।’ (সুরা আন-নাহল, আয়াত: ৫-৮)
আজকের যুগে গাড়ি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যানবাহন। মানুষের জীবনযাত্রায় এর প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক। সম্ভবত গাড়ির মতো এত দ্রুত ও গভীরভাবে সমাজের জীবনধারায় প্রভাব ফেলেছে—এমন আবিষ্কার খুব কমই রয়েছে। এখনো এটি মানুষের অন্যতম প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম। গাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহন আল্লাহর এমন নিয়ামত, যার মাধ্যমে তিনি আদমসন্তানকে সম্মানিত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর অবশ্যই আমি আদমসন্তানকে মর্যাদা দান করেছি এবং স্থল ও সমুদ্রে তাদের বহন করেছি, তাদের উত্তম রিজিক দিয়েছি এবং আমার সৃষ্টির অনেকের ওপর তাদের বিশেষ মর্যাদা দিয়েছি।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত: ৭০)
গাড়ি চালানোর সময় শরিয়তসম্মত আদব-শিষ্টাচার এবং ট্রাফিক ও ড্রাইভিংয়ের নিয়ম সম্পর্কে অজ্ঞতা মানুষের বিভিন্ন ভুল ও অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। গাড়িচালকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইসলামী আদব নিচে তুলে ধরা হলো—
গাড়িকে আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে উপলব্ধি করা: প্রথমত, যানবাহন সহজলভ্য করে দেওয়ার জন্য আল্লাহর নিয়ামতের কথা অন্তরে অনুভব করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামত গণনা করতে চাও, তবে তা গণনা করে শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয়ই মানুষ অত্যন্ত জালিম ও অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৩৪)
গাড়ি চালানোর উদ্দেশ্য বৈধ হওয়া: গাড়ি চালানোর উদ্দেশ্য অবশ্যই বৈধ হতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কাজ (কাজের প্রতিদান) নিয়তের ওপর নির্ভরশীল এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১)
আল্লাহ যানবাহনকে আরোহণ ও সৌন্দর্যের উপকরণ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং কেউ বৈধ কাজে তা ব্যবহার করলে সে বৈধ কাজই করেছে। আর যদি এর মাধ্যমে গুনাহ করার উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে সে গুনাহগার হবে।
বের হওয়ার সময় আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করা: বাড়ি থেকে বের হওয়া এবং গাড়িতে ওঠার সময় আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর যখন তুমি কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)
বাড়ি থেকে বের হওয়ার দোয়া পড়া, গাড়ির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং বিশেষ করে সফরের আগে গাড়ি ভালোভাবে পরীক্ষা করে নেওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত। নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে—যেমন সিটবেল্ট বাঁধা, যাত্রীদের নির্ধারিত আসনে বসানো এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি বা অবসন্ন অবস্থায় গাড়ি না চালানো।
গাড়িতে ওঠার সময় শরিয়তসম্মত জিকির করা: যানবাহনে আরোহণের সময় পঠিতব্য বিভিন্ন দোয়া কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। সেগুলো পড়া উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যিনি সব জোড়া সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জন্য নৌযান ও চতুষ্পদ জন্তু থেকে এমন বাহন দিয়েছেন, যাতে তোমরা আরোহণ করো। তারপর তোমরা যখন তার ওপর স্থিরভাবে বসো, তখন তোমাদের প্রতিপালকের নিয়ামতের কথা স্মরণ করো এবং বলো—পবিত্র তিনি, যিনি এটিকে আমাদের অধীন করে দিয়েছেন; আমরা নিজেরা এটিকে বশে আনতে সক্ষম ছিলাম না। আর নিশ্চয়ই আমরা আমাদের প্রতিপালকের কাছেই ফিরে যাব।’ (সুরা আয-ঝুখরুফ, আয়াত: ১২-১৪)
ট্রাফিক আইন ও নিয়ম মেনে চলা: ট্রাফিক আইন মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজের জীবন ও সম্পদ রক্ষার সাধারণ বিধানের অন্তর্ভুক্ত হলো গাড়িচালক, যাত্রী ও পথচারীদের সড়ক দুর্ঘটনা থেকে নিরাপদ রাখা। ইসলামী ফিকহ একাডেমির ৭১ নম্বর সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, যেসব ট্রাফিক আইন ইসলামী শরিয়তের বিধানের বিরোধী নয়, সেগুলো মেনে চলা শরিয়তসম্মতভাবে আবশ্যক।
কোনো মুসলিম বা অমুসলিমের জন্যই ট্রাফিকসংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় আইন অমান্য করা বৈধ নয়। কারণ এতে নিজের এবং অন্যদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্র মানুষের কল্যাণ ও ক্ষতি প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে এসব নিয়ম প্রণয়ন করে। তাই এগুলো অমান্য করা উচিত নয়।
পরিমিত গতিতে গাড়ি চালানো: অতিরিক্ত দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো যাবে না। আবার এমন ধীরগতিতেও চালানো উচিত নয়, যাতে অন্যদের চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি হয়। ভারসাম্যপূর্ণ গতিতে গাড়ি চালাতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘রহমানের বান্দারা তারাই, যারা পৃথিবীতে বিনয়ের সঙ্গে চলাফেরা করে এবং অজ্ঞ ব্যক্তিরা তাদের সম্বোধন করলে তারা বলে, সালাম।’ (সুরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৬৩)
রাস্তা থেকে ক্ষতিকর বস্তু সরিয়ে দেওয়া: রাস্তা থেকে মানুষের জন্য ক্ষতিকর বস্তু সরিয়ে দেওয়া ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে সেখানে একটি কাঁটাযুক্ত ডাল দেখতে পেল। সে সেটি রাস্তা থেকে সরিয়ে দিল। আল্লাহ তার এই কাজের জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞ হলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৭২)
রাস্তা থেকে ক্ষতিকর বস্তু সরিয়ে দেওয়া যখন ইবাদত, তখন নিজের দ্বারা রাস্তায় কোনো ক্ষতিকর বস্তু না ফেলাও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন—রাস্তায় ময়লা-আবর্জনা ফেলা কিংবা মানুষের বাড়ির দরজার সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা। এমনকি আবাসিক এলাকায় অপ্রয়োজনে বিরক্তিকর শব্দে হর্ন বাজানো এবং রাতে রাস্তায় অতিরিক্ত উজ্জ্বল হেডলাইট ব্যবহার করাও মানুষের কষ্টের কারণ। এসব থেকে বিরত থাকা উচিত।
রাস্তায় চালকদের মধ্যে সহযোগিতা করা: রাস্তায় একে অন্যের প্রতি সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সহনশীলতা প্রদর্শন করা উচিত। একজন চালক যেন অন্য চালকের জন্য অযথা সমস্যা বা বিপদের কারণ না হন, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
হারাম বিষয় থেকে দৃষ্টি সংযত রাখা: বিশেষ করে ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ি থামানোর সময় অন্যের এমন বিষয়ের দিকে তাকানো থেকে চোখকে হেফাজত করতে হবে, যা দেখা শরিয়তসম্মত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা রাস্তার হক আদায় করো।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! রাস্তার হক কী? তিনি বলেন, ‘দৃষ্টি অবনত রাখা…।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৬৫)
উদ্দেশ্যহীনভাবে রাস্তায় ঘোরাফেরা না করা: কোনো প্রয়োজন বা ভালো উদ্দেশ্য ছাড়া অযথা রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো উচিত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার পা নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে তার জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে—সে তা কী কাজে ব্যয় করেছে; তার জ্ঞান সম্পর্কে—সে তা দিয়ে কী করেছে; তার সম্পদ সম্পর্কে—কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে; এবং তার শরীর সম্পর্কে—কী কাজে তা ক্ষয় করেছে।’ (জামে আত-তিরমিজি, হাদিস: ২৪১৭)
আমানত যথাযথভাবে রক্ষা করা: যে গাড়ি চালানো হচ্ছে, সেটি সব সময় চালকের নিজস্ব সম্পদ নাও হতে পারে। এটি রাষ্ট্রের, প্রতিষ্ঠানের অথবা কোনো ব্যক্তির গাড়ি হতে পারে; কিংবা ভাড়ায় নেওয়া হতে পারে। তাই নিজের গাড়ির মতোই অন্যের গাড়ির যত্ন নিতে হবে। কারণ এটি একটি আমানত।
নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে না দেওয়া: আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না। আর তোমরা উত্তম কাজ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৯৫)
অতএব, গাড়িতে এমন কোনো ত্রুটি বা যান্ত্রিক সমস্যা থাকলে, যার কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে, তা মেরামত করতে হবে। এমন আবহাওয়ায় গাড়ি চালানো থেকেও বিরত থাকতে হবে, যখন রাস্তা বা অন্য যানবাহন ভালোভাবে দেখা সম্ভব হয় না। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত হওয়া, ডানে-বামে অমনোযোগীভাবে তাকানো, সিটবেল্ট না বাঁধা কিংবা নির্ধারিত লেন অতিক্রম করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
বেপরোয়া গাড়ি চালানো, গাড়ি দিয়ে কসরত দেখানো, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা ঘটানোর মতো নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ কাজ থেকেও দূরে থাকতে হবে।
এসব আচরণ অনেক সময় আত্মপ্রদর্শনের প্রবণতা তৈরি করে, সম্পদের ক্ষতি করে এবং কখনো নিজের কিংবা অন্যের প্রাণহানির কারণও হতে পারে।
একজন মুমিনের কাছে রাস্তা যেমন চলাচলের স্থান, তেমনি তা তার ঈমান, দায়িত্ববোধ ও উত্তম চরিত্র প্রকাশেরও একটি ক্ষেত্র।
লেখক: কাসেম শরীফ
kalprakash.com/IM