জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) পরিবহন ব্যবস্থাপনায় বাস কমিটির কার্যক্রম নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। বিভিন্ন বাসে কমিটির নামে আলাদা আসন সংরক্ষণ, মনগড়া নিয়ম চালু করা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের কারণে পরিবহন ব্যবস্থায় অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
জানা যায়, পূর্বে বাস কমিটিকে ঘিরে বিভিন্ন জটিলতা, শিক্ষার্থী হয়রানি ও অপ্রীতিকর ঘটনার কারণে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থান নিয়েছিল। এরপরও কিছু বাসে অনানুষ্ঠানিকভাবে কমিটির কার্যক্রম থাকলেও তা ছিল সীমিত। তবে জকসু নির্বাচনের পর বিভিন্ন বাসে নতুন করে কমিটি গঠনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব বাস কমিটির প্যাডে জকসুর পরিবহন সম্পাদক মাহিদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসক অধ্যাপক ড. তারেক বিন আতিকের স্বাক্ষর রয়েছে। এ কারণে কমিটির সদস্যরা নিজেদের কার্যক্রমকে প্রশাসনিক অনুমোদনপ্রাপ্ত হিসেবে উপস্থাপন করছেন বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ।
কমিটির জন্য আলাদা সিট: বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক বাসে কমিটির সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট আসন রাখার বিষয়টি সামনে এসেছে। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, আসন খালি থাকলেও সেখানে বসতে গেলে বলা হয়, ‘এটি কমিটির সিট’। ফলে তীব্র আসন সংকটের সময়ও অনেককে দাঁড়িয়ে যাতায়াত করতে হয়। এছাড়া কয়েকটি বাসে খাতা, কলম, পেন্সিলসহ বিভিন্ন সামগ্রী রেখে আগেভাগে সিট আটকে রাখার প্রবণতাও দেখা গেছে। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে বাস কমিটির দাপট দেখে মনে হয়, তারা বাসের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির চেয়েও বেশি ক্ষমতাবান। তাদের কিছু বলার সুযোগ নেই। সিট খালি থাকলেও বসতে দেওয়া হয় না। বলা হয়, এগুলো কমিটির জন্য বরাদ্দ।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা জুনিয়ররা আগে বাসে উঠলেও অনেক সময় সিট খালি থাকা সত্ত্বেও বসতে পারি না। তাদের নিয়ম না মানলে বাসে উঠতে দেওয়া হবে না—এমন পরিস্থিতিও তৈরি করা হয়।”
মনগড়া নিয়ম ও ধূমপান: বাস কমিটির কিছু সদস্য নিজেদের মতো নিয়ম তৈরি করে তা শিক্ষার্থীদের ওপর প্রয়োগ করছেন বলে জানা গেছে। এসব নিয়মের বিরোধিতা করলে অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে পড়ার আশঙ্কায় অনেক শিক্ষার্থী সরাসরি প্রতিবাদ করতে পারেন না।
এদিকে বাস চলাচলের সময় কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের ধূমপানের অভিযোগও উঠেছে। এতে অন্য শিক্ষার্থীরা চরম অস্বস্তিতে পড়লেও প্রতিবাদ করতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হওয়ার ভয়ে অনেকেই নীরব থাকেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, “বাসে ধূমপান করলে আমাদের অনেকের সমস্যা হয়। কিন্তু প্রতিবাদ করলে পরে বাসে নানা জটিলতায় পড়তে হতে পারে। তাই অনেকে চুপ থাকেন।”
এসব বিষয়ে জকসুর পরিবহন সম্পাদক মাহিদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ বাসেই আসন ফাঁকা থাকে না। আগে এলে আগে বসার নিয়মই অনুসরণ করা হয়। জুনিয়র-সিনিয়র সম্পর্কের কারণে কেউ দাঁড়িয়ে গেলে সেটিকে কমিটির জন্য নির্ধারিত আসন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কোনো কমিটির বিষয়ে অভিযোগ থাকলে শিক্ষার্থীরা নাম প্রকাশ না করেও তা জানাতে পারবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসক অধ্যাপক ড. তারেক বিন আতিক বলেন, “বাসে কমিটির জন্য আলাদা সিট বরাদ্দের কোনো নিয়ম নেই। যে আগে আসবে, সে আগে বসবে। খাতা, কলম বা পেন্সিল রেখে সিট আটকে রাখার ব্যবস্থাও বন্ধ করা হবে। বাস ছাড়ার পাঁচ মিনিট আগে বাসের দরজা খুলে দেওয়া হবে।”
ধূমপানের বিষয়ে তিনি বলেন, “বাসে ধূমপান বন্ধে আগামীকাল একটি নির্দেশনা জারি করা হবে। এরপর বাসে কেউ ধূমপান করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
র্যাগিংয়ের বিষয়ে প্রশাসনের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “র্যাগিংয়ের কোনো ঘটনা পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে প্রক্টোরিয়াল বোর্ডের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একইভাবে বাসে কোনো শিক্ষার্থীকে হেনস্তা করা কিংবা কমিটির জন্য আগে থেকে সিট বরাদ্দ রাখার বিষয়টি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট বাস কমিটির বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন ব্যবস্থা কোনো ব্যক্তি বা কমিটির নিয়ন্ত্রণে না থেকে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আসন ব্যবস্থাপনা, কমিটির কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি দাবি করেছেন তারা।
kalprakash.com/IM