দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চলমান বিরোধের মধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে আয়োজিত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সম্মেলনে এক নজিরবিহীন ও বিতর্কিত ঘটনা ঘটেছে। বক্তব্য প্রদানকালে চীন সরকারের অবস্থান সংবলিত একটি আনুষ্ঠানিক স্মারকলিপি ভুলবশত ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী গিলবার্তো তেওদোরো জুনিয়রের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপরই মঞ্চে দাঁড়িয়ে চীনের এই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং দেশটির আগ্রাসী আচরণের কঠোর সমালোচনা করেন তিনি।
গত ৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ‘সিউল ডিফেন্স ডায়ালগ’-এ দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিংয়ের তথাকথিত ‘গ্রে-জোন’ কৌশল সম্পর্কে বক্তব্য দিচ্ছিলেন তেওদোরো। সে সময় সম্মেলনের এক কর্মী ভুলবশত একটি চিরকুট তার পাশের টেবিলে রেখে যান। নোটটি হাতে নিয়ে উপস্থিত সবাইকে ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, তার কাছে একটি চিরকুট এসেছে, যা সম্ভবত চীনের পক্ষ থেকে পাঠানো। চিরকুটটিতে দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে বেইজিংয়ের অনমনীয় অবস্থানের কথা উল্লেখ ছিল। এরপর তেওদোরো নোটটির প্রতিটি বাক্য পড়ে শোনান এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি বক্তব্যের কঠোর ও তাৎক্ষণিক জবাব দেন।
মঞ্চে দক্ষিণ কোরিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের উপস্থিতিতে বেইজিংয়ের এই তৎপরতাকে আক্রমণ করে তেওদোরো বলেন, ‘এটি আর কেবল গ্রে-জোন নয়; এটি সরাসরি নিপীড়ন, গুণ্ডামি এবং সুস্পষ্ট আগ্রাসন।’ উপস্থিত দর্শকদের করতালির মধ্যে তিনি আরও যোগ করেন, ‘সম্ভবত বেইজিংয়ের যা করা প্রয়োজন তা হলো সাধারণ ভদ্রতা ও মার্জিত আচরণ শেখা। তাদের কিছুটা লজ্জা থাকা উচিত।’
দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপ জানিয়েছে, সিউলে নিযুক্ত চীনা দূতাবাসের এক সামরিক কর্মকর্তা নোটটি লিখেছিলেন। তবে আয়োজক কর্মীরা ভুলবশত সেটিকে ফিলিপাইন প্রতিনিধিদলের ভেবে তেওদোরোর কাছে পৌঁছে দেন। ওই নোটে সমুদ্র আইন সংক্রান্ত জাতিসংঘ কনভেনশনের (আনক্লস) আন্তর্জাতিক রায় মেনে না নেওয়ার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছিল বেইজিং। কাগজটি উঁচিয়ে ধরে তেওদোরো ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলেন, মুক্ত শ্রোতাদের সামনে চীনের অবস্থান কতটা অকার্যকর ও হতাশাজনক, তার স্মারক হিসেবে তিনি কাগজটি নিজের কাছে রেখে দেবেন।
এদিকে পরদিন ৯ সেপ্টেম্বর বেইজিংয়ে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এ ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং। তিনি ফিলিপাইনের কর্মকর্তাদের সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার চেষ্টা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কর্মকর্তাদের অহেতুক ঝামেলা তৈরি করা, কোন্দল উসকে দেওয়া এবং দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
উল্লেখ্য, গিলবার্তো তেওদোরো জুনিয়র দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিংয়ের আধিপত্যকামী কার্যকলাপের একজন সোচ্চার সমালোচক। বিতর্কিত জলসীমায় দুই দেশের কোস্টগার্ডের মধ্যে প্রায়ই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এমনকি সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়ানোর অভিযোগে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে বেইজিং তেওদোরোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল, যার ফলে তিনি ফিলিপাইনের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে চীনের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
kalprakash.com/IM