মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে স্ক্যাম সেন্টার খুলে আন্তর্দেশীয় চক্রের সাইবার প্রতারণা চালানোর খবর বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গণমাধ্যমে এসেছে। এবার বাংলাদেশেও সীমান্তবর্তী জেলা কক্সবাজারে এমন একটি সন্দেহভাজন চক্রের সন্ধান মিলেছে, যার সদস্যরা মূলত চীনের নাগরিক।
অর্থনীতি, বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে কেবল ভয় বা সন্দেহের চোখে দেখা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি পর্যাপ্ত সতর্কতা ছাড়া এ ধরনের কৌশলগত সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়াও সম্ভব নয়। বাংলাদেশে চীনা নাগরিক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়ার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে মানবপাচার, সাইবার প্রতারণা ও সংঘবদ্ধ অপরাধের কিছু ঘটনায় বিদেশি নাগরিকদের নাম আসছে। তবে বিষয়টি চীন রাষ্ট্র বা দেশটির সামগ্রিক নাগরিকত্ব নিয়ে নয়, কিংবা এটি সরাসরি চীনা বিনিয়োগের বিরোধিতাও নয়। মূল প্রশ্ন হলো—বৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে আন্তর্দেশীয় কোনো অপরাধচক্র যাতে বাংলাদেশে ঘাঁটি গাড়তে না পারে, তা মোকাবিলার কার্যকর সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি আমাদের রয়েছে কি না।
কক্সবাজারে কীভাবে গড়ে উঠল এমন নেটওয়ার্ক?
কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণার একটি চক্রের তদন্তে সম্প্রতি ছয়জন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৩০টি ল্যাপটপসহ বিপুল পরিমাণ আধুনিক যোগাযোগ সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এ ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—তদন্তকারীরা এ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আরও বিস্তৃত একটি নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
পুলিশ সূত্রের বরাতে জানা গেছে, প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন বিদেশি নাগরিক এ ধরনের কার্যক্রমে যুক্ত থাকতে পারেন। তাঁদের অনেকে ইতোমধ্যে গা-ঢাকা দিয়েছেন। তবে এ সংখ্যা চূড়ান্ত প্রমাণিত অপরাধী নয়, বরং সন্দেহভাজন ও তদন্তের আওতাভুক্ত ব্যক্তি।
এর পরও মূল নিরাপত্তার প্রশ্নটি সামনে চলে আসে—কক্সবাজারের মতো একটি অতি সংবেদনশীল এলাকায় এত বড় নেটওয়ার্ক কীভাবে গড়ে উঠল? কক্সবাজার কেবল পর্যটনকেন্দ্র নয়; এর একদিকে মিয়ানমার সীমান্ত এবং অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর। কাছেই রয়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবির এবং মিয়ানমারের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে পুরো অঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তা সমীকরণ এমনিতেই বেশ জটিল। এমন একটি কৌশলগত এলাকায় বিদেশি নাগরিকেরা হোটেল বা ব্যক্তিগত স্থাপনা ভাড়া নিয়ে গোপনে কার্যক্রম চালালে তা কেবল পুলিশের একক বিষয় নয়; বরং অভিবাসন কর্তৃপক্ষ, আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা, সাইবার অপরাধ দমন ইউনিট এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সম্মিলিত নজরদারির দাবি রাখে।
পার্বত্য চট্টগ্রামেও উদ্বেগের কারণ
এই সংকটের আরেকটি বেদনাদায়ক দিক হলো মানবপাচার ও ভুয়া বিয়ে। অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে আন্তর্দেশীয় বিয়ের নাম করে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা বাংলাদেশি নারীদের নিশানা করা হচ্ছে। সম্প্রতি ১৯ বছর বয়সী এক তরুণী অভিযোগ করেন, তাঁকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে অচেতন করে এক চীনা নাগরিকের সঙ্গে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া হয় এবং পরে চীনে পাচার করা হয়।
একই ধরনের অভিযোগ এসেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকেও। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নারীদের লক্ষ্য করে পাচারকারী চক্র তৎপর রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। রাঙামাটির এক চাকমা নারী তাঁর বোনকে জোর করে চীনা নাগরিকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার অভিযোগে মামলা করেছেন। খাগড়াছড়ির এক মারমা নারীকেও একই ধরনের পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
এসব ঘটনা থেকে সব আন্তর্দেশীয় বিয়েকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ নেই। তবে পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পরিবারভিত্তিক ‘কিউ-১’ ভিসায় অন্তত ৪ হাজার ২২৬ জন বাংলাদেশি নারী চীনে গেছেন। ২০২২ সালে এ সংখ্যা মাত্র ৩৫ থাকলেও ২০২৩ সালে তা দাঁড়ায় ১ হাজার ১৬, ২০২৪ সালে ১ হাজার ৩৭৮ এবং ২০২৫ সালে ১ হাজার ৭২১ জনে। এটি নিশ্চিতভাবে মানবপাচারের প্রমাণ না হলেও দ্রুত বাড়তে থাকা অভিবাসন রুটের নির্দেশক, যেখানে কঠোর যাচাই-বাছাই আবশ্যক। এ বিষয়ে ঢাকায় চীনা দূতাবাসও সতর্কবার্তা জারি করে জানিয়েছে, অবৈধ বিয়ের মধ্যস্থতা ও নারী কেনাবেচা মানবপাচারের মতো মারাত্মক অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষার ক্ষেত্র হতে পারে প্রতিবেশী অঞ্চল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে অনলাইন প্রতারণাকেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে অর্থপাচার, মানবপাচার ও জোরপূর্বক শ্রমের মতো জটিল আন্তর্জাতিক মাফিয়া সাম্রাজ্যে রূপ নিয়েছে। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া ও লাওসের প্রতারণাকেন্দ্রে বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রলুব্ধ বা পাচার হয়ে আসা প্রায় ৩ লাখ মানুষ কাজ করছে। এই বাস্তবতায় স্বেচ্ছায় অভিবাসন ও মানবপাচারের মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্য চিহ্নিত করতে বাংলাদেশের কার্যকর স্ক্রিনিং কাঠামো প্রয়োজন।
বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে নিরাপত্তার হিসাব
বাংলাদেশের বৃহৎ অবকাঠামো, বন্দর ও পরিবহন খাতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ অপরিহার্য। তবে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে বাজার, যোগাযোগব্যবস্থা ও মানুষের অবাধ চলাচলের সুযোগ উন্মুক্ত হয়। বিশ্বের বহু দেশের মতো বাংলাদেশেরও এখন একটি আধুনিক ‘ফরেন ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্ক’ গড়ে তোলা দরকার, যাতে কৌশলগত খাতে জাতীয় নিরাপত্তা অটুট থাকে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও কৌশলগত সংযম
আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে সাইবার নিরাপত্তা ও সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার নানা অভিযোগ প্রায়ই আলোচনায় আসে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারত ও চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতা, বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতি এবং মিয়ানমারের সংঘাতের মুখে থাকা বাংলাদেশকে সাইবার নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক তথ্য সুরক্ষায় অত্যন্ত সতর্ক ও পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখতে হবে।
আঞ্চলিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
বাংলাদেশে কোনো আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র স্থায়ী ভিত্তি পেলে তা শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; আঞ্চলিক পর্যায়েও উদ্বেগ বাড়াবে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—আইন প্রয়োগে দুর্বল বা নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে দেশের পরিচিতি তৈরি হওয়া। অপরাধীরা যদি সহজে ভূয়া পরিচয়, স্থানীয় মধ্যস্থতাকারী ও লজিস্টিক সুবিধা পেয়ে সীমান্ত পাড়ি দিতে পারে, তবে সেই ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হবে।
করণীয় ও আশু পদক্ষেপ
বৈধ বিদেশি বিনিয়োগ ও নাগরিকদের পূর্ণ নিরাপত্তা ও সহযোগিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপরাধ দমনে কোনো ছাড় দেওয়া চলবে না। সংবেদনশীল এলাকায় বিদেশিদের অবস্থান, আবাসন ভাড়া, টেলিযোগাযোগ ডাটা ও আর্থিক লেনদেনের সমন্বিত মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বিয়ে মধ্যস্থতাকারীদের কঠোর নিবন্ধনের আওতায় আনা এবং সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। কক্সবাজারের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নাকি বড় কোনো আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের অংশ—তা উদঘাটনে বেইজিংয়ের সঙ্গে পারস্পরিক তথ্য আদান-প্রদান ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি। সময় থাকতেই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণই পারে এ ধরনের ঝুঁকি থেকে দেশকে সুরক্ষিত রাখতে।
kalprakash.com/IM