মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের অকুতোভয় বীর সন্তান বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর)। ১৯৭১ সালের এই দিনে যশোর জেলার শার্শা উপজেলার গোয়ালহাটি ও ছুটিপুরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে বীরদর্পে লড়াই করে তিনি শাহাদাতবরণ করেন।
১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সম্মুখযুদ্ধের একপর্যায়ে পাকবাহিনীর গুলিতে সহযোদ্ধা নান্নু মিয়া গুরুতর আহত হন। নূর মোহাম্মদ শেখ তখন নিজের হাতে এলএমজি তুলে নেন এবং আহত নান্নুকে কাঁধে নিয়ে শত্রুপক্ষের ওপর অবিরাম গুলি ছুঁড়তে থাকেন। একপর্যায়ে শত্রুপক্ষের মর্টারের গোলার আঘাতে তাঁর হাঁটু ক্ষতবিক্ষত হয়ে ভেঙে যায়। তবুও অসীম সাহসিকতায় তিনি গুলি চালানো অব্যাহত রাখেন। একসময় দেশের জন্য আত্মাহুতি দিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন এই বীর সেনানী। পরবর্তীতে সহযোদ্ধারা তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে যশোরের শার্শা উপজেলার কাশিপুর গ্রামে সমাহিত করেন। মুক্তিযুদ্ধে অনন্য আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইল সদর উপজেলার চণ্ডিবরপুর ইউনিয়নের মহিষখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মোহাম্মদ আমানত শেখ ও মা জেন্নাতুন্নেছা (মতান্তরে জেন্নাতা খানম)। শৈশবেই তিনি বাবা-মাকে হারান এবং সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর দুই স্ত্রীর কেউই বেঁচে নেই। বর্তমানে তাঁর এক ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছেন; যারা নড়াইল ও যশোরে বসবাস করছেন।
তাঁর কর্মজীবন থেকে জানা যায়, ১৯৫৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসে (ইপিআর, বর্তমানে বিজিবি) যোগদান করেন। দীর্ঘদিন দিনাজপুর সীমান্তে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৭০ সালের ১০ জুলাই তিনি যশোর সেক্টরে বদলি হন এবং ল্যান্স নায়েক পদে পদোন্নতি পান।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে নূর মোহাম্মদ শেখ যশোর অঞ্চল নিয়ে গঠিত ৮ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধে অংশ নেন। এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৮ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী এবং সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন মেজর এস এ মঞ্জুর। নূর মোহাম্মদ যশোরের শার্শা উপজেলার কাশিপুর সীমান্তের বয়রা অঞ্চলে ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার নেতৃত্বে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ পরিচালনা করেন।
এদিকে, এই বীরশ্রেষ্ঠের স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে ২০০৮ সালের ১৮ মার্চ তাঁর জন্মভূমি মহিষখোলা গ্রামের নাম পরিবর্তন করে ‘নূর মোহাম্মদ নগর’ করা হয়। একই সঙ্গে সেখানে গড়ে তোলা হয় বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর, স্মৃতিস্তম্ভ এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ।
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ আবদুল ছালাম জানান, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নূর মোহাম্মদ নগরে কোরআনখানি, শোভাযাত্রা, স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল এবং সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁর জীবনীভিত্তিক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
kalprakash.com/IM