মতপার্থক্য মানবজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। একই পরিবারে, একই প্রতিষ্ঠানে কিংবা একই মতাদর্শের মানুষের মধ্যেও দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তার পার্থক্য থাকতে পারে। ইসলাম মানুষের এই স্বাভাবিক বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করেনি; বরং মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে কীভাবে ন্যায়বিচার, শালীনতা ও প্রজ্ঞা বজায় রাখতে হবে—পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহে তার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আজকের পৃথিবীতে মতভিন্নতা যেন ক্রমেই অসহিষ্ণুতায় রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ ভিন্নমত প্রকাশ করলেই তাকে অপমান, বিদ্রুপ, কটূক্তি কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হতে হয়। এমনকি ধর্মীয় মতপার্থক্যও কখনো কখনো এমন তিক্ততায় পৌঁছায় যে একজন মুসলিম অন্য মুসলিমের সঙ্গে সম্পর্ক পর্যন্ত ছিন্ন করে ফেলে। অথচ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জীবন আমাদের সামনে ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে আচরণের এক অনন্য ও কালজয়ী আদর্শ তুলে ধরে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সত্যের ব্যাপারে ছিলেন আপসহীন, তবে সত্যের দাওয়াত ও উপস্থাপনের ক্ষেত্রে ছিলেন সর্বোচ্চ প্রজ্ঞাবান। তিনি ভুলকে ভুল বলেছেন, কিন্তু ভুলকারী মানুষকে শোধরানোর সুযোগ দিয়েছেন। বিরোধীদের সঙ্গে তিনি যুক্তি ও দলিলের মাধ্যমে কথা বলেছেন, কিন্তু কখনো অশালীন ভাষা ব্যবহার করেননি। কেউ তাঁর প্রতি কঠোর আচরণ দেখালেও তিনি নিজের চরিত্রের সৌন্দর্য বিসর্জন দেননি। পবিত্র কোরআনে দাওয়াত ও বিতর্কের পদ্ধতি নির্ধারণ করে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করো সর্বোত্তম পন্থায়।’ (সুরা: আন-নাহল, আয়াত: ১২৫)
এই আয়াতের শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। ইসলাম শুধু সত্য কথা বলার নির্দেশ দেয়নি, বরং সত্যকে কীভাবে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে হবে, তাও শিখিয়েছে। যুক্তি ও দৃঢ়তার সঙ্গে বজায় রাখতে হবে হিকমত, নম্রতা ও সুন্দর পদ্ধতি। কোরআনে আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে। ন্যায়বিচার করো; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা: আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৮)
এটি ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে আচরণের অন্যতম মৌলিক নীতি। কারও সঙ্গে রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা ব্যক্তিগত মতপার্থক্য থাকলেও তাঁর প্রাপ্য অধিকার নষ্ট করা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) অমুসলিমদের সঙ্গে পারস্পরিক লেনদেন, চুক্তি ও প্রতিবেশীসুলভ আচরণে মানবিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বহু দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, বিশ্বাসের পার্থক্য থাকলেও সামাজিক সৌহার্দ্য ও ন্যায়বিচার বজায় রাখা সম্ভব।
নবীজির জীবনে বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষের সঙ্গে আলোচনা ও মতবিনিময়ের বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। ইহুদি, খ্রিষ্টান, মুশরিক ও মুনাফিকরা তাঁর কাছে বিভিন্ন প্রশ্ন ও আপত্তি নিয়ে এসেছে, কখনো কঠোর ভাষায় কথা বলেছে; কিন্তু তিনি পরিস্থিতির গুরুত্ব ও ব্যক্তির অবস্থা বিবেচনা করে পরম প্রজ্ঞার সঙ্গে জবাব দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা আহলে কিতাবের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রেও নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘উত্তম পন্থা ছাড়া তোমরা আহলে কিতাবদের সঙ্গে বিতর্ক কোরো না।’ (সুরা: আল-আনকাবুত, আয়াত: ৪৬)
মুসা ও হারুন (আ.)-কে ফেরাউনের মতো চরম জালিম শাসকের কাছে পাঠানোর সময়ও আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘তোমরা তার সঙ্গে নম্র ভাষায় কথা বলো; হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।’ (সুরা: ত্বহা, আয়াত: ৪৪)। ফেরাউনের মতো ব্যক্তির সঙ্গেও যদি শিষ্টাচার বজায় রাখার নির্দেশ থাকে, তবে সাধারণ পারস্পরিক মতভেদে আমাদের ভাষা কতটা সংযত হওয়া উচিত, তা সহজেই অনুমেয়। (তাফসিরে ইবনে কাসির: ৪/৫৪২; মাআরিফুল কোরআন: ৬/৭০২)।
মহানবী (সা.) কঠোর স্বভাবের মানুষের সঙ্গেও সামাজিক শালীনতা বজায় রাখতেন। হাদিসে এসেছে, উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে প্রবেশের অনুমতি চাইলে তিনি বলেন, ‘তাকে অনুমতি দাও; সে তার গোত্রের নিকৃষ্ট ব্যক্তি।’ কিন্তু লোকটি ঘরে প্রবেশের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) তার সঙ্গে অত্যন্ত নম্রভাবে কথা বলেন। পরে আয়েশা (রা.) কারণ জানতে চাইলে নবীজি (সা.) বলেন, ‘কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে মর্যাদার দিক থেকে নিকৃষ্টতম ব্যক্তি সে-ই, যার অশালীন আচরণ থেকে বাঁচার জন্য মানুষ তাকে পরিহার করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৫৪)। অপর এক বর্ণনায় নবীজি (সা.) বলেন, ‘হে আয়েশা! ধীরস্থির হও এবং কোমলতা অবলম্বন করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২৫৬)।
আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। কেউ নিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটি মতামত প্রকাশ করলেই কমেন্টে বা ইনবক্সে গালিগালাজ কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণ শুরু হয়। কটু মন্তব্যের জবাবে আরও কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হয়। ফলে সামান্য মতভিন্নতা রূপ নেয় তীব্র শত্রুতা ও সামাজিক কলহে। কিন্তু ইসলাম শেখায়, অন্যের নেতিবাচক ভাষা যেন আপনার উন্নত চরিত্রকে ক্ষুণ্ন না করে।
পবিত্র কোরআনে মুমিনদের সতর্ক করে বলা হয়েছে, ‘তোমরা একে অপরকে মন্দ উপাধিতে ডেকো না।’ (সুরা: আল-হুজুরাত, আয়াত: ১১)। আরও বলা হয়েছে, ‘তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে বেঁচে থাকো; নিশ্চয়ই কিছু অনুমান পাপ। আর তোমরা অন্যের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান কোরো না এবং একে অপরের গিবত কোরো না।’ (সুরা: আল-হুজুরাত, আয়াত: ১২)।
অতএব, যেকোনো মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে সত্য ও তথ্য যাচাই করা, অপরকে বোঝার চেষ্টা করা এবং কটু ও অপমানজনক ভাষা পরিহার করে মার্জিত আচরণ বজায় রাখাই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা।
kalprakash.com/IM