সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ যুদ্ধের জন্য নতুন অস্ত্র, অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সক্ষমতা প্রস্তুত রেখেছে ইরান। এসব ‘নতুন চমক’ সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রেই প্রকাশ করা হবে বলে জোর দিয়ে জানিয়েছেন ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনীর লজিস্টিকস বিভাগের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজা তালায়ি-নিক।
দেশটির ‘সরকারি সপ্তাহ’ উপলক্ষে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সির (ইরনা) কার্যালয় পরিদর্শনকালে সংস্থাটির রাজনৈতিক প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি ইরনার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসেইন জাবেরি আনসারির সঙ্গেও সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তালায়ি-নিক বলেন, গত দুই বছরে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের প্রশাসনকে অত্যন্ত সংবেদনশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এর মধ্যে দুটি যুদ্ধ, একাধিক নিরাপত্তা হুমকি এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ভূরাজনীতি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তিনি উল্লেখ করেন, শত্রুভাবাপন্ন শক্তির ব্যাপক ভৌগোলিক আক্রমণ ও সামরিক শক্তি সত্ত্বেও সরকার নিয়মিত সেনাবাহিনী, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং সেন্ট্রাল খাতাম আল-আনবিয়া সদর দপ্তরের যাবতীয় কৌশলগত প্রয়োজন পূরণে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে শত্রুপক্ষ তাদের মূল লক্ষ্য অর্জনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
তালায়ি-নিক জানান, সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোতে ক্ষয়ক্ষতি হলেও তা রাজনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, শিল্প ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে অগ্রগতির নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগেই ইরান অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম ও গোলাবারুদের কৌশলগত মজুত গড়ে তুলেছিল। এমনকি যুদ্ধ চলাকালেও প্রায় ৯ হাজার ৩০০টি জ্ঞানভিত্তিক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সমরাস্ত্র উৎপাদন অব্যাহত রাখা হয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠান ইরানের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা শিল্পের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সক্ষমতা জোগান দিচ্ছে এবং এর ফলে কিছু সরঞ্জামের উৎপাদন কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের অস্ত্র উৎপাদন দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কয়েকটি পণ্যের উৎপাদন বহুগুণ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দূরপাল্লার ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তিতে ইরান বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে যাওয়ার পথে রয়েছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত অস্ত্রের রপ্তানি কার্যক্রমও অব্যাহত থাকবে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, ইরান বর্তমানে ১ হাজারেরও বেশি ধরনের অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম ও গোলাবারুদ নিজস্ব কারখানায় উৎপাদন করছে এবং প্রতিরক্ষা খাতে দেশটির স্বনির্ভরতার হার ৯০ শতাংশেরও বেশি। প্রতিরক্ষা শিল্প এখন আর কেবল বিদেশি অস্ত্রের ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’য়ের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং কিছু ক্ষেত্রে নিজস্ব উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও নকশার পর্যায়ে পৌঁছেছে।
যুদ্ধের প্রধান ‘নতুন চমক’ হিসেবে ইরানের স্থিতিস্থাপকতা ও প্রতিরোধ ক্ষমতাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শত্রুপক্ষ আশা করেছিল যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের সামরিক, প্রতিরক্ষা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সক্ষমতা ভেঙে পড়বে, কিন্তু বাস্তবে তার বিপরীত চিত্র দেখা গেছে।
তালায়ি-নিক বলেন, ইরানের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা কৌশল এখনো সমন্বিত ও অসমমিতিক (অ্যাসিমেট্রিক)। এর মূল লক্ষ্য হলো প্রতিরক্ষামূলক কাঠামোর মধ্য থেকেই কার্যকর আক্রমণাত্মক কৌশলের মাধ্যমে শত্রুকে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ নিতে না দেওয়া। এছাড়া ড্রোনবিরোধী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ১২ দিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ফলে পরবর্তী সংঘাতে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, আকস্মিকতার নীতি বজায় রেখে অস্ত্র, আধুনিক প্রযুক্তি ও সামরিক কৌশলের ক্ষেত্রে আরও কিছু বড় চমক তৈরি রাখা হয়েছে, যা যথাসময়ে যুদ্ধক্ষেত্রেই প্রকাশ করা হবে।
সূত্র: ইরনা
kalprakash.com/IM