ইমান একজন মুসলমানের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ এবং ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির একমাত্র সনদ। ইমানহীন মানুষ লক্ষ্যহীন, বিভ্রান্ত ও চরম দুর্ভাগ্যগ্রস্ত। ইমান যেমন মহামূল্যবান, তেমনি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এটি লাভ করা যেমন পরম সৌভাগ্যের বিষয়, তেমনি অসতর্কতা ও উদাসীনতার কারণে ইমান হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের কাতারে শামিল হয়ে যাওয়াও অসম্ভব নয়। বর্তমান যুগ বহুমুখী ফিতনার যুগ। চারদিকে বিভ্রান্তিকর মতবাদ, নৈতিক অবক্ষয়, ভোগবাদ, মিথ্যা প্রচারণা এবং হারামকে স্বাভাবিক করে তোলার প্রবণতাসহ নানাবিধ ফিতনা দিন দিন বিস্তার লাভ করছে। ফলে এই সময়ে ইমানের ওপর অবিচল থাকা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে অন্ধকার রাতের খণ্ডের মতো ফিতনা গোটা সমাজে ছেয়ে যাবে। তখন সকালের মুমিন সন্ধ্যায় কাফিরে পরিণত হবে।’ (সুনানে তিরমিজি)
আজকের সমাজে নিত্যনতুন ফিতনার যে ঝড় বইছে, তাতে সচেতন মুমিনমাত্রই উপলব্ধি করতে পারেন যে আমরা এক কঠিন সময় অতিক্রম করছি। তাই এই ফিতনাসংকুল সময়ে ইমানের ওপর অটল থাকতে হলে ইমান সম্পর্কে বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন, যেসব কারণে ইমান দুর্বল বা বিনষ্ট হতে পারে সেসব বিষয় জানা এবং ফিতনা থেকে আত্মরক্ষার উপায় সম্পর্কে সচেতন হওয়া অপরিহার্য।
সাহাবায়ে কেরাম (রা.) সর্বদা নিজেদের ইমানের সুরক্ষার ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন ও শঙ্কিত থাকতেন। হাদিসে এসেছে, একবার হজরত হানজালা (রা.) অনুভব করলেন, নবীজি (সা.)-এর সান্নিধ্যে থাকলে তাঁর অন্তর আল্লাহমুখী ও কোমল থাকে; কিন্তু নবীজির কাছ থেকে ফিরে স্ত্রী-সন্তান ও পার্থিব ব্যস্ততায় যুক্ত হলে অন্তরের সেই অবস্থায় পরিবর্তন আসে। তিনি বিষয়টি হজরত আবু বকর (রা.)-কে জানালে তিনিও একই উদ্বেগের কথা প্রকাশ করেন। (সহিহ মুসলিম)
নবীজি (সা.)-এর প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে থেকেও সাহাবিরা যখন নিজেদের ইমান নিয়ে এত শঙ্কিত থাকতেন, তখন বর্তমানের এই ফিতনাপূর্ণ যুগে আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা ও সতর্কতা কতটা প্রয়োজন, তা সহজেই অনুমেয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রত্যেক মুমিনের উচিত নিজের ইমান সুরক্ষিত রাখতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া:
১. সঠিক জ্ঞান অর্জন: ফিতনাসংকুল সময়ে ইমান রক্ষার প্রথম ধাপ হলো সমসাময়িক ফিতনাগুলো সম্পর্কে গভীর ও সঠিক জ্ঞান অর্জন করা। বিনোদন, খেলাধুলা কিংবা সংস্কৃতির নামে কীভাবে ইমানবিধ্বংসী চিন্তা ও জীবনদর্শন সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা বোঝা অত্যন্ত জরুরি। নাস্তিকতা, বস্তুবাদ, ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার প্রসার কিংবা তথাকথিত স্বাধীনতার নামে অনৈতিকতাকে স্বাভাবিক করার অপচেষ্টা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। কারণ ফিতনার স্বরূপ চিনতে না পারলে তা থেকে আত্মরক্ষা করা অসম্ভব।
২. তাকওয়া অবলম্বন: আল্লাহভীতি বা তাকওয়া হলো মুমিনের সবচেয়ে শক্তিশালী বর্ম। হালাল-হারামের প্রশ্নে কোনো আপস না করা, আল্লাহর প্রতিটি বিধান আন্তরিকভাবে মেনে নেওয়া এবং গোপনে ও প্রকাশ্যে সর্বদা আল্লাহর ভয় অন্তরে জাগ্রত রাখা মুমিনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করার শক্তি দান করবেন, তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ পরম অনুগ্রহশীল।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ২৯)
৩. কোরআন ও সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা: যেকোনো বিভ্রান্তিকর বা জটিল পরিস্থিতিতে সবার আগে দেখতে হবে পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা কী। কোনো ব্যক্তিবিশেষের মত, আবেগ, সামাজিক চাপ বা প্রচলিত সংস্কৃতিকে প্রাধান্য না দিয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর বিধানকেই চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা এ দুটিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকবে, ততদিন কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না—আল্লাহর কিতাব এবং আমার সুন্নাহ।’ (মুয়াত্তা মালিক)
৪. নিয়মিত দোয়া ও জিকিরে মশগুল থাকা: মুমিনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো দোয়া। ফিতনা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মহান আল্লাহর একান্ত অনুগ্রহ ও সাহায্যের কোনো বিকল্প নেই। তাই সঠিক পথে অবিচল থাকার জন্য প্রতিনিয়ত আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করা এবং সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন দোয়া ও জিকির অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
৫. বিজ্ঞ আলেমদের পরামর্শ অনুযায়ী চলা: যেকোনো ধর্মীয় বা জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিজ্ঞ, আমানতদার ও মুত্তাকি আলেমদের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। তাঁদের দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ মেনে চললে বিভ্রান্তি ও বিপথগামী হওয়ার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত থাকা সম্ভব হয়।
kalprakash.com/IM